রবিবার, ১১ জুন, ২০২৩

৩য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা - প্রচ্ছদ কাহিনী - ধানজীবন - সায়ন্তনী মহাপাত্র মুদী

 


ধানজীবন

সায়ন্তনী মহাপাত্র মুদী

মানুষে মানুষে দেখা হলে খালি সেই এক প্রশ্ন,  তোমার নাম
কি
? দেশ কোথা তোমার? হিন্দু তুমি, না মুসলমান? বাড়িখান ভাড়ার নাকি নিজের?"

কই কেউ কেন শুধোয়না- 'তুমি কোন সময়ের মানুষ বাছা?’ এ বুঝি ধরে নেবার জিনিস, যে এই সময়ে আছি বলে আমাকে এখনকারই মানুষ হতে হবে? এ ভারী অন্যায় কথা! এই সময়ে পা রেখে আমি বুঝি মনে মনে অন্য সময়ে বাঁচতে হতে পারিনা!

মানছ না তো!

আচ্ছা বেশ। তুমি বরং নিজের মনের মধ্যিখানেই একবার ডুব দিয়ে দ্যাখো। তোমার বুঝি সবসময় এই সময়টায় বাঁচতে ভালোলাগে? বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে যখন ফুটপাথের ইঁট পাতা উনুনে ভাত ফোটার গন্ধ আসে, গলির মুখের চায়ের দোকানে যখন কয়লার আগুনে টোস্ট সেঁকার ঘ্রান ওঠে, তোমার ইচ্ছে করে না এক ছুটে সেই সন্ধেগুলোয় ফিরে যেতে? যেখানে সিমেন্টের মেঝেতে আসন পেতে বসে গরম গরম চারা মাছের ঝোল দে ভাতের গরাস মুখে তুলে দিত কেউ?

আমরা সকলেই আসলে নিজের মনের মধ্যে আর একখান হারিয়ে যাওয়া সময় নিয়ে বাঁচি। চাইলেও তাকে না পারি ছুঁতে, না পারি ফিরে যেতে। কিন্তু তা বলে সে একটুও মিথ্যে নয়। এই যে আমাকেই দ্যাখো না কেন, আধুনিক এই সময়ে, এক আধুনিক শহরের বুকে দাঁড়িয়েও কেন জানি আমার মন পড়ে থাকে সেই খেতখামারের দেশে, মাটির উঠোনে, যেখানে বোশেখ থেকে পোষ - রোদ, বৃষ্টি আর শিশিরের পর্যাবৃত্ত অনুসরণ করে মানুষের জীবন আবর্তিত হয় জলকাদা মাখা চাষের খেতে।

পর্যাবৃত্ত, কী কঠিন একখান শব্দ না! এই পৃথিবীতে যা কিছু প্রাণবন্ত, যার শুরু আছে, তার শেষও আছে। আর এই শুরু আর শেষের মধ্যে থাকে পুরো একটা জীবন।

যেমন ধর চাল। তুমি বলবে এ আবার জীবন কোথায়! ধান ভেনে চাল আর চাল ফুটিয়ে ভাত, এই তো।

তা নয় গো তা নয়।

এই দেখতে সামান্য ধানেরও একটা ভারী সুন্দর একটা জীবনচক্র আছে, সে জীবনের যেমন এক অনিশ্চিত ছন্দ আছে তেমনি আছে একরাশ ভালোলাগা। তার খবর শুধু রাখে চাষিবাসী মানুষে। ভেবে দ্যাখো শুধু পেটের জ্বালা মেটায় বলে নয়, মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু, সুখে, দুঃখে, আনন্দে, সমস্ত শুভকাজে ধান আর চালের কি অপরিহার্য উপস্থিতি। শিশুর অন্নপ্রাশন, পুজোর নৈবেদ্য, আশীষের থালা, মেয়ের বিয়ের কনকাঞ্জলি থেকে মৃত্যুর পরের পিন্ডদান। ধান আর চাল ছাড়া সব যে মিছে। তা মানুষের জীবন চক্রের সাথে এত ওতপ্রোত সম্পর্ক যে শস্যের আজ না হয় তার জীবনটাই একবার ঘুরে দেখলাম।

দীঘির জলে টুপ টাপ হিজল খসার দিন শেষ হয়ে যখন বর্ষার কালো মেঘের ছায়া পড়ে, চাষি মানুষের ব্যস্ততাও ওমনি শুরু হয়। ওই দ্যাখো আকাশ পানে চেয়ে চেয়ে বলাই কাকা কেমন হাঁটা দিয়েছে মাঠের পানে। ওই ও পাড়ার দুলাল দাদাও কাকারে ডেকে সঙ্গে নিলো। আজ ওরা বীজতলার জমি তৈরী করবে। ক্যানেল থেকে খাল কেটে জল এনে কাদা কাদা করে, মই দিয়ে সমান করবে এক টুকরো জমি। তারপর কোনও এক বিষ্যুদবার, সকাল সকাল চান করে, গত পুজোর লালপাড় শাড়িখান গায়ে দিয়ে,  এক মাথা সিঁদুর পরে কাকী উঠোনের উনুন লেপে পায়ে সে রাঁধতে বসবে। সেই সুগন্ধি  'উকনিমধু' চালের পায়েস, তেলসিঁদুর, মঙ্গল ঘট আর শঙ্খধ্বনি দিয়ে মায়ের আবাহনের পরে শুরু হবে ধানের যাত্রা।

 

দুরুদুরু বুকে, মায়ের স্মরণ নিয়ে আঁকুর ধান ছড়িয়ে দেবে ওইখানিক জলজ মা জমিতে। মাটির আদর, জলের সিঞ্চন আর সূর্যের তাপে সেই বীজধান বড় হয়ে জলের বুকে সবুজ মখমলি কিংখাবের মতো ঝলমল করবে। দুপুরে শাপলার ঝোল দিয়ে ভাত মেখে নিতে নিতে বলাইকাকা মনে মনে হিসেব করবে কোন জমিতে কী ধান রুইবে। ওই পুবের ছটাক খানেক জমিতে 'জটাবাঁশফুল'.  বুড়ি মায়ের খাবার জন্য খুব সহজপাচ্য। মেয়েদের আবদার আগালিধান, বচ্ছরকার দিনে বাপের বাড়ি এসে দুধ ভাত খাবার এই আহ্লাদটুকু বাপেরে যে রাখতিই হয়, দক্ষিণের জমিতে সারা বছরের মুড়ির জোগাড়ের জন্য বেশ খানিকটা 'নারকেল ঝোপা', পিঠে পুলির জন্যি পশ্চিমের বিলের ধারের জমিতে খানিক 'কটকতারা' আর বাকি জমিতে সারা বছরের ভাতের যোগানের জন্য 'হিদি' . নিজের মনেই হেসে ফেলে বলাই কাকা। ঠাকমা যে ছড়া কাটতেন, "যদি না থাকে হিদি, গুষ্টি পেলব কিদি?" শুনে কাকীও কেমন হাসতে লেগেছে দ্যাখো। দেখে দুগ্গা দুগ্গা করতে লেগেছে বুড়ি শাশুড়ি, ছেলে বৌয়ের এই সোনাঝরা হাসি যেন সোনার ফসল হয়ে গোলায় ওঠে গো মা।

কিন্তু তার আগে যে মেলা কাজ। বৃষ্টি ভেজা মাটি লাঙ্গল চালিয়ে কতক উপর নীচ করা, বচ্ছরকার জমা করে রাখা সার গাদা টেনে রোদ খাওয়ানো, তারপর সেই সার জমিতে ছড়িয়ে মাটি সমান করে তাতে বর্ষার জল খাওয়ানো, ভাঙা আল বেঁধে মজবুত করা। তারপর কোনও এক সকালে কাকা, কাকী, ছেলে, বৌমা নেমে পড়বে মাঠের গোড়ালি ডোবা জলে। বীজতলা ভেঙে গোছা গোছা ধানের ছড়া খানিক জলের আদর খাবে। তারপর সারে সারে লাগানো হবে গোটা জমি জুড়ে।

তারপর? তারপর খালি ঘর আর বার, আকাশে মেঘের আর মাটিতে জলের আন্দাজ নেওয়া, দুরুদুরু বুকে ঠাকুরকে ডাকা আর অসীম অপেক্ষা।

নিজের ছন্দে শ্রাবন পেরিয়ে ভাদ্র পড়ে। রোদবৃষ্টির লুকোচুরির ফাঁকে সবুজ ধানের ক্ষেত কেমন এক শান্তির সবুজ গালচে পেতে রাখে। দুবাড়ি ভিক্ষে করার ফাঁকে নিমাই দাদু ওখানেই শুয়ে একটু জিরিয়ে নেয়। রোদ বৃষ্টি মাথায় করে আগাছা তোলা, সার দেওয়া, খাল কেটে জল আনা, আল সারানোর ফাঁকে ওসবের বালাই নাই আলতাফ মিয়াঁর!

 

তবুও ভাদ্রের অকাল ঝড়ে যখন আকাশ অন্ধকার করে বাদল নামে তখন ধানের ক্ষেতের ওপর ওই শনশন করে বয়ে যাওয়া ঝড় দেখে কেমন মাটি থেকে পা ওঠেনা আলতাফের। দূর থেকে সে দেখতে পায় কচি ধানের ডগায় শিহরণ তুলে ঝড় এগিয়ে আসছে, কী যে এক বিধ্বংসীরূপ সেই ঝড়ের! নরম সবুজ ধানের গাছগুলোরও সেকী অসীম দাপট। ঝড় যত বাড়ে পাল্লা দিয়ে বাড়ে তাদের এদিক ওদিক মাথা নাড়া। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সবুজ সমুদ্রে উত্তাল ঢেউ এর ফণা আছড়ে আছড়ে পড়ছে। দেখে বুকে বল পায় আলতাফ, তুফান আসুক কি বান, আল্লার কৃপায় এবার ধান ঠিক গোলায় উঠবে।

দেখতে দেখতে দুগ্গাপূজা আসে। যায়। পূজার শেষে মণ্ডপ যখন ভাঙা বাসরের মতো একলাটি নিশ্চুপে পড়ে থাকে, তখন কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে মাঠ ভেসে যায় কী এক মায়াময় জোছনায়। বড়ঠাকুর বাড়ির শাঁখের আওয়াজে তড়িঘড়ি উঠে বসে জটেশ্বর। ক্ষেতের পারে, বাঁশের মাচায় বসে মাঠ পাহারা দিতে দিতে কখন জানি চোখ লেগে গিয়েছিল। উঠে বসে, গায়ের দোলাইখান জড়িয়ে নেয় ভালো করে। নিশ্চুপ সেই রাতে, পরিষ্কার শুনতে পায় ধানের বুকে হিম পড়ার টুপটাপ আওয়াজ। চরাচরব্যাপী জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া মাঠের দিকে তাকিয়ে কেমন অবশ লাগে জটেশ্বরের। চাঁদের আলো বুঝি এত সাদা হয়! চোখ কচলায় জটেশ্বর। মনে হয় যেন বিশাল এক সাদা পাখির দুধ সাদা পাখা বেয়ে মুক্তোর মতো আলো গড়িয়ে পড়ছে ধানের বুকে, মাটিতে কার যেন পায়ের ছাপ মঙ্গলময় আল্পনা এঁকেই আবার হারিয়ে যায়। বারেবারে চোখ কচলায় জটেশ্বর, ধানের মাঠে এত জাদুও লুকিয়ে থাকে! 

 

ঢাকের বাদ্যির আওয়াজ কমতে না কমতেই এসে পড়বে নল সংক্রান্তি, ধানের সাধভক্ষণের দিন। আশ্বিনের শিশিরে, মাটির ভালোবাসায় আর মৌমাছির আনাগোনায় ধানের তখন বিয়েন ছেড়ে থোড় আসে, বুকে টলটল করে দুধ। খরায়, বন্যায় যে ধান মানুষরে আগলে আগলে রাখে সে যে ঘরের মেয়েরও বাড়া। গর্ভবতী মেয়ের কল্যাণে ওই দ্যাখো নিতাই পন্ডিত কেমন আদার বাদাড় ঘুরে জড়ো করতে লেগেছে কাঁচা হলুদ, আদা, নিম , ওল, কেঁউ, কেতকী আর কালমেঘের পাতা। লোহার হামান দিস্তায় ছেঁচে ওই দিয়ে তৈরি হবে 'বনজ', সৃষ্টির আদি কীটনাশক। কেটে রাখা নল গাছের মাথায় পাকুড় পাতায় মুড়ে এইসব ওষধি পুঁতে দিয়ে আসবে ধান জমির ঈশান কোণের মাটিতে।

পেঁপের খোলায় তেল ঢেলে বাতি ডোবাতে ডোবাতে বড় চোখ জ্বালা করে নিতাই পণ্ডিতের। গেল বছর এমনি সময়ে বাচ্চা বিয়োতে গিয়ে চলে গেলো ছোটমেয়েটা। মা মরা সেই নাতি আজকে মন উঠোনময় টুলটুল করে হাঁটে। ধুতির খুঁটে চোখের জল মুছে জোরে জোরে পন্ডিত বলে ওঠে, 'অশ্বিন যায় কার্তিক আসে, মা লক্ষ্মী গর্ভে বসে। 'শাঁখ , কংসাল , ঘন্টা ধ্বনি আর ধুপ ধুনোর ধোঁয়ায় পোয়াতি সেই মেয়ের মুখ আর ধানের গাছ সব কেমন এক লাগে। চোখের জলে ভেসে যেতে যেতে খেত খামার ঘুরে ঘুরে সে কেবল বলতেই থাকে-

“নল পড়লো ভুঁয়ে, যা শনি তুই উত্তর মুয়ে।

এতে আছে আদা, ধান হবে গাদা গাদা।

এতে আছে শুকতা , ধান হবে মনি মুক্তা। ...”

না কোনোভাবেই ছোট মেয়ের দশা যেন না হয় এই পোয়াতি ক্ষেতের। কেবল এক খোকা তো নয়, এর মুখ চেয়ে যে বাঁচে অনেক অনেক মানুষ।

দেখতে দেখতেই এসে পড়ে অঘ্রাণ মাস। শীত আস্তে আস্তে থাবা বসায় এলিয়ে থাকা মাটির ঘর বাড়িতে। মাঠময় সোনারঙা ধানে হিমেল হাওয়ার মাতামাতি, রোদের ছটায় হীরের মতো ঝিকিয়ে ওঠা রাতের শিশির- মাঠময় যেন মণি মাণিক্যেরই চাষ। চাষীর ঘরের পরমধন এবার মাঠ ছেড়ে গোলায় উঠবে। ঘরে ঘরে তোড়জোড় চলে মুঠ কাটার। অঘ্রানের সকালেই তাই দেখ বড় খোকা স্নান করে, সাদা ধুতি পরে, গন্ধ, চন্দন, বেলপাতা নিয়ে রওনা দিয়েছে মাঠের পানে। পাশে পাশে শাঁখে ফুঁ দিতে দিতে পিসি কইতে থাকে, "একটাও কথা যেন কইসনি বাপ্ আমার" . তাতে বড় খোকা বিরক্ত হলেও পিসির ভারী বয়েই গেছে। কে না জানে মুঠ কাটার সময় কথা কৈলে ঘরে অলক্ষ্মী আসে।

"ততো মার্গে তুসং প্রাপ্তে কেদারেশু ভবাসরে l

ধান্যস্যল বনং কুর্যাৎ সার্দ্ধ মুষ্টিদ্বয়ং শুচিঃ ll

গন্ধৈঃ পুষ্পৈশ্চ নৈবেদৈ ধূপৈশ্চ ধান্য বৃক্ষকান l

পুজয়িত্বা যথান্যায় ভিশানেল বনং চরেৎll

তত স্তন্মস্তকে কৃত্বাসম্মুখ্যং শীর্ষ কান্বিতম l

স্পৃষ্ঠান কিমপি ব্যাপি ব্রজেন্মৌনেন মন্দিরম্ ll

সপ্ত পদ্যাং ততঃ পাদং দত্বামুখ্য নিকেতনে l

প্রবিশ্চ স্থাপয়েত্তত্র পূর্বভাগে সুপুজিতম ll” (কৃষি পরাশর )

 

মাঠে পৌঁছে গঙ্গা জল ছিটিয়ে, ঈশান কোন থেকে আড়াই প্যাঁচে খোকা আড়াই মুষ্টি ধান কাটে। নামাবলীর ছোপ দেওয়া কাপড় পিসি আলতো হাতে এগিয়ে দেয়। ধানের ভারে ঝুলে থাকা সেই শীষ গোছা খোকা ভারী যত্নে মুড়ে নেয় সেই নতুন কাপড়ে। কাটা গাছের গোড়ায় সিঁদুর আর ফুল রেখে রওনা দেয় বাড়ির মুখে। তারপর বাড়ির দোরগোড়ায় বড়বৌ পাধুয়ে দিলে সাতপা হেঁটে সে ধানের গোছা মা লক্ষ্মীর আসনের পাশে রেখে পূজা করে। আজ চাষি বাড়ির বড় আনন্দের দিন। নতুন ফসল আর নবান্নের আনন্দ সকলের চোখে মুখে। কদিন এখন ঘরে ঘরে মেয়ে জামাইয়ের আসা যাওয়া, লঘু ধানের পিঠে পায়েস আর ফল পাকুড়, কদমা , মঠ , কাঁচা দুধ দিয়ে ভেজানো চাল মাখা 'নবান্ন' খাওয়ার নিমন্ত্রণ। বছরভর কী এক অনিশ্চিত সময়ের পরে আজ আশায় বুক বাঁধে চাষা। স্বপ্নে ভাসে নতুন চালের, নতুন ভাতের গন্ধে।

ঘরে ঘরে এখন সাজো সাজো রব। মুনিশ, বাগাল, ধানকাটা, ধান ঝাড়ার শব্দে ভারী হয়ে থাকে হেমন্তের নরম রোদ , বাতাসে ভাসে তুষের গন্ধ। ধান ঝেড়ে খামারে তুলতে পারলি যে গেরস্ত মানুষের শান্তি। তারপর ধান সিদ্ধ না হওয়া অব্দি খানিক হাতপা মেলে বসতে পারবে বৌ ঝিয়েরা। কিন্তু এখন যে তাদের একটুকনিও সময় নেইকো।

পৌষ মানেই চাষার ঘরে পৌষলক্ষীর আগমন। ঘর, খামার, উঠোন নিকিয়ে তকতকে করে রাখতে হয়। মা আসবেন তার জোগাড় চলে দিন ভর। ঘরে ঘরে এখন ঢেঁকিতে পাড় দেবার আওয়াজ আর গেরস্ত বৌয়ের আনন্দের গান -

"ও ধান ভান, ধান ভান রে , ঢেঁকিতে পাড় দিয়া

ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া

ও ধান ভানিয়া কিনুম শাড়ি, পিন্দা যাইমু বাপের বাড়ি

সোয়ামি যাইয়া লইয়া আইবো গরুর গাড়ি দিয়া। .."

 গান শুনতে শুনতে মুঠ কাটা ধানের গাছ পাকিয়ে চাষা তৈরী করে বাউনি। পোষলক্ষ্মীকে আদর, যত্নে ঘরে বেঁধে রাখার এ এক নিরলস প্ৰয়াস। সিন্দুক, আলমারি, ধানেরমরাই , দরোজার কড়া সব জায়গায় চাষা বাউনি বাঁধে আর মনে মনে বলে, এস মা আমার ঘরে এস (আউনী ), আমার ঘরে, গোলাঘরেরধানেমাবেঁধেবেঁধেবসতকোরো (বাউনি), দেখোমা- তোমার আশীর্বাদে আমার ঘরের সুখ শান্তি যেন অটুট থাকে (চাউনি)। চাষার সে প্রার্থনা বুঝি ধ্বনিত হয় বিশ্ব চরাচরের সমস্ত জনপদে।

আজ পোষসংক্রান্তির ভোরবেলায় ওই দেখো আলের পথে পথে ইন্দির ঠাকমা কেমন ছুটে ছুটে চলতে লেগেছে। বড্ড বকবকায় ঠাকমা তাই সবাই খানিক এড়িয়েই চলে কিন্তু ঠাকমার আল্পনা দেবার হাতখানি যে খাসা। নিজেদের উঠোন, মারাই ঠাকমার হাতের ছোয়ায় সাজিয়ে নেবে বলে আজ ঠাকমার খুব তোয়াজ। ওই ছুটে ছুটে এখনও পাড়ার সরকারবাড়ি যাবে আগে। বেটে রাখা আতপচালের গুঁড়োয়, নিকিয়ে রাখা উঠোনে ফুটিয়ে তুলবে মাঙ্গলিক নকশা। ধানের ছড়া, লক্ষীর চরণ, মঙ্গলঘট , লাঙ্গল, মরাই , মায়ের বাহন প্যাঁচা, ঢেঁকি , কুলো আর গেরস্ত বৌয়ের মনের সুপ্তবাসনা কানের দুল, গলার হার সব বুড়ির হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠবে একে একে। আর আঁকবে মালক্ষ্মীর পদচিহ্ন, বাহির দরজা থেকে উঠোন হয়ে ঠাকুরঘর পর্যন্ত। কোজাগরী রাতে দেখা জটেশ্বর এর সেই ছোট্ট ছোট্ট পায়ের ছাপ। আজ আর সেই ছাপ মিলিয়ে যায়না বরং চালের গোলা শুকিয়ে আরো প্রস্ফুটিত হয়ে ফুটে ওঠে মাটির বুকে। যারা বলছিলে ধান ভানিয়ে চাল আর চাল ফুটিয়ে ভাত, ভেবে দ্যাখো দিকি পেট ভরানোই যার কাজ সেই একশস্যের জীবনে, মানুষ জুড়ে দিয়েছে কত শ্রী।

সরকার বাড়ির ছোট খুকি বসে বসে ঠাকমার আল্পনা দেওয়া দেখে আর শুধায়, “আল্পনা কেন দেই আমরা ঠাকমা? " টনটন করা পিঠ খানিক সোজা করে ঠাকমা বলে, “খানিক মালক্ষ্মীর জন্য ঘরদোর সাজাই আমরা দিদিভাই। আর মনুষ্যেতর জীবের সঙ্গে এভাবেই ভাগ করে নেই আমাদের আনন্দের ফসল। এই যে চালের গোলার আল্পনা, এই খেয়ে বাঁচবে ছোট ছোট কীটপতঙ্গ। রাতে পূজার পরে বাঁশবাগানে খাবার রেখে আসা হবে কুকুর, শেয়াল, কাক, পাখি এদের জন্য। উনুনের পায়েস পিঠা বিলানো হবে ঘরে ঘরে। খিদে কি কেবল আমাদের একার দিদি? যে খিদে আমার পেটে জ্বালা ধরায়, সে আগুন জ্বলে বিশ্বের সবার পেটে।  'আমার যে ক্ষুধা , সে যে বিশ্বেরও ক্ষুধা ' (ব্রম্ভ বান্ধব উপাধ্যায়) উৎসর্গ, নিবেদন , অর্পণ না থাকলি যে মানুষ পশু হয়ে যাবে দিদিভাই।“

 

ছোট মেয়ে সে, কি বুঝলো তা সেই জানে। বুড়ি শুধু আশায় বুক বাঁধে ধানের জীবনচর্যা অনুসরণ করে বড় হয়ে ওঠা এই মেয়েও একদিন সকলেরে বেঁধে বেঁধে থাকতি শিখবে।

কিন্তু বুড়ি কি আর জানে এই মেয়ে বড় হতে হতে এই পৃথিবী কতখানি বদলে যাবে! কোনও বলাই কাকারে আর হিসেবে কষতে হবে না বিঘা প্রতি মুড়ির ধান, পান্তার ধান, পার্বনের ধানের। নল সংক্রান্তির ভেষজের খবর রাখবেনা কোনো নিতাই পণ্ডিত, না বড় খোকা অঘ্রানের ভোরে চান করে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে মাঠে যাবে মুঠ কাটতে। খালি কোথাও নতুন ধান উঠলে পৌষের সন্ধেয় জন্মান্তরের চাষবাসের ইতিহাস ঘাই মারবে রক্তে। নীলটালির রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সেদিন মেয়েটারও খুব ইচ্ছে হবে একটু চাল গুলে ঠাকমার মতো আল্পনা দিতে। চালের গুঁড়ো, নারকেলের ছাই, নতুন গুড় দিয়ে মায়ের মতো পিঠে গড়ে সবার ঘরে পাঠাতে।

পারবে কি মেয়েটা? এর উত্তর জানে কেবল সময়।

কিন্তু আজকের এই ব্যস্ত জীবনে, হারিয়ে যাওয়া সেই সময়ের খোঁজ রাখে কোন জনে ?

 

হেমকণা পায়েস

(প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর আমিষ ও নিরামিষ আহার )

 

উপকরণ:

ডেলা ক্ষীর বা মেওয়া : ৬০ গ্রাম

আমন্ড বা কাজু বাদাম : ১৫ গ্রাম

চালের গুঁড়ো : ৩০ গ্রাম

জাফরান : এক চিমটি

দুধ : .৫ লিটার

চিনি : ১২৫ গ্রাম

পেস্তা পরিবেশনের জন্য

 

পদ্ধতি :

বাদাম ভিজিয়ে রেখে খোসা ছাড়িয়ে মিহি করে বেটে নিন। মেওয়া কুরিয়ে নিয়ে ওর সঙ্গে মাখুন। চিনি মেশান,  একটু করে চালের গুঁড়ো মিশিয়ে মিশিয়ে ময়দা মাখার মতো করে শক্ত করে মাখুন। ঢাকা দিয়ে রাখুন ১৫ মিনিট। তারপর মটরশুঁটির দানার মাপে ছোট ছোট দানা কেটে মসৃন করে গুলি পাকান।

 

তলা ভারী পাত্রে দুধ ফুটিয়ে ঘন করুন। ওতে জাফরান মেশান। ২০-২৫ মিনিট পরে দুধ বেশ ঘন হলে আঁচ বন্ধ করে চিনি মেশান। চিনি গলে গেলে হেমকণার দানা গুলো মেশান। এই পর্যায়ে বেশি নাড়বেন না।

সাধারণ তাপমাত্রায় এনে, পেস্তার টুকরো ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

 -------------------------------------------------------------

সায়ন্তনী মহাপাত্র মুদী বিশ্বভারতীর ছাত্রী।

বাংলার রন্ধন সংস্কৃতি নিয়ে সতত চর্চায় নিয়োজিত। নিজেও একজন রন্ধনশিল্পী।

শনিবার, ১০ জুন, ২০২৩

৩য় বর্ষ ২য় সংখ্যা - প্রচ্ছদ কাহিনী - স্বাধীনতার পর - অভিষেক রায়

 স্বাধীনতার পর

অভিষেক রায়

  

বিশেষ সংখ্যার কিছু বার্ষিকী আমাদের সবসময়েই খুব বিশেষ। ২৫, ৫০, ৭৫, ১০০ থেকে ২৫০। এই বার্ষিকীগুলো গাণিতিক নিয়মে যেমন একটিকাল অধ্যায় অতিক্রম করে এতটা পথ পেরিয়ে আসার কথা জানায়, তেমনি অতটা পথচলার উপলব্ধি ও অনুভূত করায়। কী পেলাম? কী পেলাম না? আরও কী পাওয়ার আছে? আসলে একটি ব্যক্তিবিশেষের জন্মবার্ষিকীতে তাঁর জীবনের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা অনেক সহজ। সেখানে সুবিধা আছে তাঁর আয়ুর বৃত্তের সীমানার মধ্যে পরিমাপ। কিন্তু এখানে বিষয়টা দেশের স্বাধীনতা- যে এখনো নদীর মত বহমান। কখনো তার জোয়ার, কখনো ভাঁটা, কখনো কোনওটাই নয়। তাই এই ফিরে দেখা খুব কঠিন বা এই ফিরে তাকানো একেবারে অন্যরকম। লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে তাহলে কি ভারতের বয়স পঁচাত্তর! আসলে কত বয়স ভারতের!

মনে হতেই পারে যে দেশের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের, যে দেশের ঐতিহ্য গৌরব কাহিনী লেখা আছে কত ইতিহাস বইতে, সেই দেশটির উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম, বিভিন্ন খণ্ড একত্রিত হয়ে এক পূর্ণরূপ হল ভারত। ১৯৪৭ অগাস্টে যার নূতন যাত্রা সূচিত হয়েছিল।   দুশো বছরের ঔপনিবেশিক শাসনকে চূর্ণ করে, দেশকে শুধুমাত্র একটি উপনিবেশের তকমা থেকে মুক্ত করে, তার অধিবাসীদের উপনিবেশের একজন প্রজার অস্তিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পবিত্র পরিতৃপ্তি আর কিছু কি হতে পারে! ১৯৪৭র ১৫ অগাস্ট একটি বিদেশী রাজার শাসিত উপনিবেশ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেছিলাম আমরা। এই অর্জন এক বিশাল অর্জন।

স্বাধীনতা একটি চেতনা। যে চেতনা ছাড়া পূর্ণ মানুষ হওয়া যায় না। আর দেশ মানেই তো মানুষ। এই ৭৫ বছরের সন্ধিক্ষণে এই দেশের আত্মপ্রকাশ, অস্মিতা নির্মাণ, তার অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাস হয়ত ঘুরে ফিরে দেখে নিতে ইচ্ছে করে। মূলধারার ইতিহাস বলে-ভারতের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, সশস্ত্র বা অহিংস যাতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অংশগ্রহণ করেছিল নারী, পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা, তা বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর গণআন্দোলন। একদিকে যেমন ছিল মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অহিংস সত্যাগ্রহ অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শক্তির চোখে ধুলো দিয়ে অক্ষশক্তির দেশে গিয়ে তাদের সাহায্যে যে স্বাধীনতার যুদ্ধ করা যায় তার দৃষ্টান্ত রাখলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু এবংআজাদহিন্দফৌজ ক্ষুদিরাম বসু, চাপেকর ভাতৃদ্বয়, ভগত সিং, যতীন দাস, রাম প্রসাদ বিসমিল, আশফাকুল্লাখানের বলিদানও এই স্বাধীনতা যুদ্ধের জ্বলন্ত ইতিহাস। মহিলাদের ভূমিকা ও চিরস্মরণীয়। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, সুনীতি চৌধুরী, শান্তি সুধা ঘোষ, বীণা দাস, কমলা দাশগুপ্ত, লীলা রায় এবং মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মত্যাগের কথা না বললে সম্পূর্ণ হয়না এই কথা। আবার মূলধারার আন্দোলনই স্বাধীনতা লড়াইয়ের একমাত্র ইতিহাস নয়। তিতুমীর এবং বিরসা মুণ্ডা জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হওয়ার বহু দশক আগেই ব্রিটিশ শাসক জমিদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে শহীদ হয়েছিলেন। ১৮৫৭র মহাবিদ্রোহ, ১৯০৫র বঙ্গভঙ্গ পর্যায় থেকে ব্রিটিশ বিরোধী আরো অসংখ্য সংগ্রাম হয়েছে যাতে যোগ দিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ।

 

আবার এই আন্দোলনের মধ্যেই নির্মিত হয়েছিল এবং জেগে উঠেছিলস্বদেশীচেতনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোহন দাস গান্ধী দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য গ্রাম স্বরাজ ভাবনার মাধ্যমে দেশকে মুক্তি দিয়েছিলেন ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকে। রবীন্দ্রনাথেরশান্তিনিকেতন, ‘শ্রীনিকেতন, গান্ধীরসবরমতী’, ‘সেবাগ্রামএবং শ্রীঅরবিন্দের পণ্ডিচেরী আশ্রম মনে করিয়ে দিয়েছে প্রাচীন ভারতের আশ্রমিক মডেল এক স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনচর্যা। এক বিকল্প যাপন। আজকের বিকল্প অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা জীবনযাত্রার সন্ধানে যা আমাদের কাছে হয়ে আছে আদর্শ। এ লেখার বিষয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস নয়, কিন্তু ৭৫র ইতিবৃত্ত রচনায় এই আবেগ ধরে রাখাও সহজ নয়। বরং এই পূর্ব কথা না থাকলে পরবর্তী কথা বলাই সম্ভব নয়।

 

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে স্বাধীনতা প্রাপ্তির সাথে ভারত দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে।স্বাধীনতার সাথে আরেকটি শব্দ উঠে এলদেশভাগ মধ্যরাতেই শুরু হয়েছিল নারকীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, খুন, ধর্ষণ এবং নিমেষে গৃহহীন হয়েছিল লক্ষ, লক্ষ মানুষ। একটু আগেই উল্লেখ করলাম, ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিশ্বের বৃহত্তম গণআন্দোলন, তেমনি দেশভাগও ঘটিয়েছিল বিশ্ব ইতিহাসে বৃহত্তম গণবাস্তুচ্যুতি।

 

জওহরলাল নেহেরু বাবাসাহেব আম্বেদকর দেশকে গঠন করলেন আধুনিক সাংবিধানিক পরিকাঠামোয়। ভারত মর্যাদা পেল পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের। তৈরি হল পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। যার মধ্যে অন্যতম ছিল বাঁধ প্রকল্প। দেশের কৃষি ব্যবস্থার জন্যে চাই জল। নেহেরু ঘোষণা করলেন এই বাঁধগুলোই হল আধুনিক ভারতের মন্দির। আর এই মন্দিরবানাতে ধ্বংস হল বন, জঙ্গল, পাহাড়, গ্রাম। উৎখাত হল হাজার, হাজার ভূমিজ মানুষ, সমীক্ষা বলছে যার  ৭০% বেশী মানুষ পায়নি পুনর্বাসন। তাদের কথা প্রাধান্য পায়না সংবাদ মাধ্যমে। গান্ধী তাঁরগ্রামস্বরাজভাবনায় বলেছিলেন সাত কিলোমিটারের মধ্যে একজন গ্রামবাসী যেন খুঁজে পান তার জীবনধারণের ন্যুনতম চাহিদা-  খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা পথ্য। সে স্বপ্ন চুরমার করে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিজেদের অন্নসংস্থানের জন্যে নিত্য চলে যেতে হল হাজার হাজার মাইল দূরে নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন করে এক অন্য আর্থ সামাজিক বলয়ে। শহরে গড়ে উঠল বস্তি। শহরে থেকেও শহুরে জীবনের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে যাদের অক্লান্ত শ্রম চলমান রেখেছে উচ্চবিত্ত শ্রেণীকে। নেহেরুর প্রবর্তিত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রক্রিয়া প্রাথমিকভাবে যদিও ছিল রাজ্য কেন্দ্রের সুসম্পর্ক সাযুজ্য স্থাপন, কেন্দ্র রাজ্যের মধ্যে হবে মতবিনিময়-কিন্তু সে ব্যবস্থা ক্রমে হয়ে উঠল রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রের আধিপত্য কায়েম এবং ধীরে ধীরে পথ করে দিল আমূলকেন্দ্রীকরনের। তার ফল বর্তমানকালে আমরা ভালভাবেই উপলব্ধি করছি। আবার জাতীয় পরিকল্পনার মধ্যে ছিললাইসেন্সরাজ বেসরকারী মূলধনে ব্যবসা করতে গেলেই লাগবে সরকারের অনুমতি। কয়েক দশক চলেছিল আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি। তাই শুরু থেকেই দুর্নীতি ছিল ভারতের নিত্যসঙ্গী।

 

কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার বিরোধী দল হলে কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত অর্থ আসেনা এবং যেকোনও প্রক্রিয়ায় ন্যাক্কারজনকভাবে একটি নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে কেন্দ্র ফেলে দিতে পারে। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রেগণতন্ত্রবিপন্ন হয়। এ দৃষ্টান্তও দেখা গেছে।

১৯৫০ এর সংবিধানে বর্ণ লিঙ্গ বৈষম্য তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাত দশক পরেও দুটোই সমানভাবে ক্রিয়াশীল। লোকসভা ও রাজ্যসভায় মহিলাদের অংশগ্রহণ এখনও কম। দেশে দলিতদের এখনও ভয়ঙ্কর হিংসার শিকার হতে হয়। সন্তানসম্ভবা এক দলিত রমণী উচ্চবর্ণের জল ছোঁয়ায় এবং এক দলিত বালক হিন্দু উৎসবে যোগ দিলে তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়। উন্নয়নের নামে এখনো জাতীয় সড়ক, কয়লা খনি, বিদ্যুৎ প্রকল্প বা কোন জাতীয় নেতার মূর্তিস্থাপনের নামে উৎখাত হতে হয় গ্রামের পর গ্রাম আদিবাসী সম্প্রদায়কে, সে যতই আমরা ৭৫ একজন দলিত রমণীকে রাষ্ট্রপতিরূপে পাইনা কেন!  হতাশা ব্যর্থতার কারণ বোধহয় এখানেই। এই প্রান্তবাসী মানুষগুলোর ওপর রাষ্ট্রের প্রকৃত মানসিকতার পরিচয় আমরা পাই ২০২০ মার্চে। অতিমারীর সময় কয়েক ঘণ্টায় লকডাউন হয়ে গেলে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের ঘরে ফেরার জন্যে সম্বল ছিল তাদের দুটি পা। করোনায় নয়, বাড়ি ফিরতে প্রাণ গেছিল বহু মানুষের। এখানে প্রশ্ন আসতেই পারে দলিতদের সুদীর্ঘকালের বৃহত্তর আন্দোলন কি শেষমেশ একটিটোকেনপ্রাপ্তি?!

 

যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো রেখেও রাজ্যগুলির থেকে একটু একটু করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রীকরণের একটি উদ্বেগজনক দিকহল শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স অর্থাৎ জি. এস. টি. প্রণয়ন। জি. এস. টি.র মাধ্যমে রাজ্যগুলির অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে রাজ্যগুলিকে কৌশলগতভাবে তাদের বরাদ্দের ন্যুনতম ভাগ থেকে বঞ্চিত করা হল। জি.এস.টি সাথে আরেকটি বিশ্বব্যাপী পরিভাষা জি. ডি. পি. এখন ভারতীয় অভিধানের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এই পরিভাষার সংজ্ঞা হল একটি দেশের ভিতরে এক বছরে চূড়ান্ত উৎপাদিত দ্রব্য সেবার সমষ্টিগত মূল্য।জি. ডি. পিএমন এক পরিভাষা যার পরিসংখ্যান থেকে বাদ পড়ে যায় অসংগঠিত বৃত্তের অগুন্তি মানুষের অর্থনৈতিক অবদান। খুব সোজা কথায় এই পরিভাষা গাছকাটাকে সংযোজন ভাবে, গাছপোঁতাকে নয়। এই পরিভাষার নেই কোন অর্থনৈতিক দর্শন।

 

এই ৭৫ বছরে এই দেশ দেখেছে মানুষকে গর্জে উঠতে।৪৭ এক দশকের মধ্যেই চরম খাদ্যসংকট শুরু হয় যার ফলে লাগাতার খাদ্য আন্দোলন, দেখেছে চরম শোষণ থেকে কৃষকদের পুলিশের বন্দুকের সামনে তীরধনুক, বর্শা তুলে নিতে। এই কৃষক বিদ্রোহ রূপ দিল এক বৃহত্তর আন্দোলনের। এই কৃষকরাই কিন্তু ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রথম রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। নকশালবাড়ির মত একটি প্রত্যন্ত এলাকা হয়ে উঠেছিল বিপ্লবের অগ্নিগর্ভ যার আগুন ছড়িয়ে পড়ল সারা বাংলায় এবং ভারতে। এই আন্দোলনে পুলিশের নির্মম অত্যাচারের বলি হতে দেখেছে অসংখ্য যুবক, যুবতীকে। বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষার দাবীতে প্রাণ দিয়েছিলেন তেরো জন। তেলেগুভাষী স্বতন্ত্র রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশের দাবীতে প্রাণ দিলেন পট্টিশ্রী রামাল্লু। উত্তরাখণ্ডের তেহরিতে গাছ বাঁচাতে স্থানীয় মহিলারা গাছকে জড়িয়ে ধরে এক অনন্য সাধারণ আন্দোলনের নজির সৃষ্টি করলেন। স্থানীয় ভাষায় জড়িয়ে ধরাকেচিপকোবলা হয়। চিপকো আন্দোলন এখন আন্তর্জাতিক পরিবেশ আন্দোলনের প্রতীক। নর্মদা নদী তীরের জনজাতির অস্তিত্ব বাঁচাতে, সর্দার সরোবর বাঁধ রুখতে শুরু হল দশকব্যাপীনর্মদা বাঁচাও আন্দোলন সাম্প্রতিককালের দুটি আন্দোলন এখনো দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। যখন ভারতীয় নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের মত একটি ভয়ঙ্কর বৈষম্যমূলক বিল আনল বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার, তখন সারা দেশের মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল। অতিমারী পরিস্থিতির মধ্যেও সাংসদদ্বারা গৃহীত তিনটি কৃষি আইন, যাকে কৃষকবিরোধী কালা আইন মনে করা হয়, তার প্রতিবাদে এক বছর দিল্লীও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী অবস্থান দেখল সারাদেশ। সরকার আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হল।স্বাধীন দেশে জনগণ নির্বাচিত সরকারের এরকম আরোপিত জনগণ বিরোধী নীতি নির্ধারণ সত্যিই আশ্চর্যের! সাধারণ মানুষের বিরোধিতা ছাড়া আর কী উপায় থাকে! তখন মনে হয় স্বাধীনতা কি তাহলে এক প্রকার ক্ষমতার হস্তান্তর মাত্র!!

১৯৭৫- ‘৭৭ ভারতের সংবিধানের ওপর সবচেয়ে বড় আক্রমণ এসেছিল যখন ইন্দিরা গান্ধীর সরকার জরুরী অবস্থা জারি করল। ওই একুশ মাস ছিল ভারতের এক কঠিন সময়, যখন খর্ব হয়েছিল সব গণতান্ত্রিক অধিকার। দেশ এই প্রথম দেখেছিল, সংবাদ মাধ্যম সেন্সর হতে।  যদিও ওই সরকারই কয়েক বছর আগেই পূর্বপাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের নৃশংস শাসন থেকে মুক্তি দিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে যুদ্ধে জিতে এক নূতন রাষ্ট্রের, পৃথিবীর একমাত্র বাংলাভাষী রাষ্ট্রের জন্ম দিয়ে এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে তার শিখ দেহরক্ষীরা হত্যা করলে দিল্লীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলল শিখ বিরোধী দাঙ্গা। তিন, চার দিনে নির্মম ভাবে হত্যা করা হল শিখ সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষকে। প্রশাসন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হল এই হত্যা রুখতে। প্রশ্ন উঠেছিল সরকারের নির্লিপ্ত থাকা বিষয়ে। কয়েক দশক বাদে  ২০০২ গুজরাতে গোধরায় মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে একরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। প্রশাসনের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠেছিল।

এখানে ভেবে দেখার যে ঔপনিবেশিক শক্তিকে রুখতে যে সংগ্রাম দেশকে একত্রিত করেছিল, কয়েক দশকের মধ্যেই সেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষেরা, কাশ্মীর, পঞ্জাব, উত্তর পূর্ব এবং দক্ষিণে তামিলনাড়ু স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবীতে সশস্ত্র সংগ্রামে সামিল হল। রাষ্ট্রের সশস্ত্র প্রশাসন সেই সংগ্রাম বলপূর্বক বন্ধ করেছে। কিন্তু সমস্যা তাতে বিশেষ মেটেনি।

 

নব্বইয়ের দশকে ভারতীয় রাজনীতি আমূল বদলে দিল। সবচেয়ে বদলে দিল দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা। বিষয়টি হয়তো খুব রেখে ঢেকে বলারও কিছু নেই। রামজন্মভূমির আন্দোলনের কথাই বলছি। আশির দশকের মাঝামাঝি অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে সূচনা হল গৈরিক রাজনীতি। এরপর দেশব্যাপী রথযাত্রা। শুরু হল সাম্প্রদায়িক সমস্যা এবং ১৯৯২র ডিসেম্বর ঘটল সেই কলঙ্কিত ঘটনা- বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলল হিন্দু মৌলবাদীরা। দেশ দেখল লাগাতার দাঙ্গা, সাথে কার্ফু। এক মৌলবাদ জন্ম দেয় অপর মৌলবাদের। কয়েক মাসের মধ্যে মুম্বাই শহরে হল বোমা বিস্ফোরণ। এই রকম আতঙ্কের সাথে পরিচিত ছিলনা ভারত। এই বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা চলল কয়েক দশক। ২০০৮ এর ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ে পাকিস্তানের ইসলামী মৌলবাদী সংগঠনের কিছু আতংকবাদী কয়েকদিনের দানবিক হামলা চালাল। খুব বড় প্রশ্ন উঠে আসে যেদেশে মন্ত্রীদের নিরাপত্তার জন্যে খরচ হয় কোটি, কোটি টাকা, সেখানে জনসাধারণের নিরাপত্তা কোথায়! আবার নব্বইয়ের সূচনাতেই মুক্তঅর্থনীতির খোলাবাজার অর্থনীতিতে আনল পরিবর্তন। এতে আউটসোর্সিং এর সুযোগ যেমন এল তেমনি এক ধরণের সর্বগ্রাসি ক্রনি ক্যাপিটেলিস্টদের উদ্ভব হল যারা বর্তমানে অনেকটাই দেশের অর্থনীতির নীতি নির্ধারক। সত্তরের দশক থেকে শুরু হলেও বিগত তিন দশকে লক্ষ লক্ষ কৃতি ছাত্রছাত্রী পাড়ি দিয়েছে ইউরোপ মার্কিন মুলুকে, যাদের মেধায় লাভবান হতে পারত দেশ। তবে সেসব দেশে স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিশ্বমানের কৃতিত্ব অর্জন করে তারা ভারতের নামও পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের দরবারে। একথাও অস্বীকার করা যায়না।

 

এক দশক পূর্বে একটি নূতন রাজনৈতিক দললোক পালবিল প্রসঙ্গে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক দিয়েএক আমূল রাজনৈতিক সংস্কারের দাবীতে ক্ষমতায় এসেকিছু ইতিবাচক কাজ করলেওআমূল সংস্কার বা বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থা আনতে পারেনি। তেমনি পশ্চিম বাংলায় ৩৪ বছরের বাম জমানার দুর্ভেদ্য কিন্তু ঘুণধরা, ব্যর্থ শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটানো তৃণমূল কংগ্রেসেরমত নতুন দলের যেমন কৃতিত্ব তেমনই ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে দুর্নীতির দুর্নামে জর্জরিত।

 

বর্তমান সরকার আসার পর থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চলছে আঘাত। মুসলমান সম্প্রদায়ের থেকে মৌলিক অধিকার, নাগরিকত্ব সবকিছু কেড়ে নিয়ে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখার নানা কৌশল চলছে। কয়েকশো বছরের ইসলামী ইতিহাসের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে তা মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। এই গৈরিক দলের বহুকালের স্বপ্ন হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। রাজনৈতিক অবস্থা দেখে মনে হয়, পুরোদমে চলছে তার প্রক্রিয়া। ২০১৬য় হঠাৎ হল নোট বন্দী- বাজারে কালো টাকা উদ্ধারই নাকি এর প্রধান কারণ। কিন্তু আদপে তা হয়নি।  নোটবন্দীর ফলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমেছে এবং ক্ষতি হয়েছে অসংখ্য ছোট ব্যবসা এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে। নিমেষের মধ্যে টাকার নোট বাতিল হওয়ায় .টি.এম. থেকে টাকা তুলতে অপেক্ষা করতে লাইনে মৃত্যু হয়েছে দেড়শোর বেশি মানুষ। 

 

অন্যদিকে গণতান্ত্রিক অধিকার দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। সংখ্যালঘু মানুষদের মৌলিক অধিকার, পরিবেশ আন্দোলন এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আক্রান্তদের হয়ে যারাই সোচ্চারে প্রতিবাদ করছে, তাদেরই যেতে হচ্ছে কারান্তরালে বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকালের জন্যে। খুন হয়েছেন লেখক, কবি, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক। কোনও বিচার হয়নি সেসব হত্যাকাণ্ডের।

 

এই লেখা যখন লিখছি তখন খবর বলছে বিশ্ব খাদ্যসূচকে ভারত ১০৭। লিঙ্গ ব্যবধানের ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশ ভিয়েতনামের থেকেও নীচে। ৭৫ বছরে জাতীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি করা যায়নি। বিশ্ব সমীক্ষায় জনস্বাস্থ্যে ভারতের র্যাতঙ্ক ১৩৫ নম্বরে। অন্যদিকে ফর্বসের তালিকায় ধনী ভারতীয়দের সংখ্যা প্রতি বছর উত্তরোত্তর বাড়ছে। তাই ভারতীয় সমাজে চলমান    অসমতা এক রুঢ বাস্তব।

১৯৪৭র পরেও ভারত ভূমি, জঙ্গল, নদী এবং প্রাকৃতিক সম্পদে ইংরেজ ঔপনিবেশিক আইনের বাইরে যেতে পারেনি। আগে এই সম্পদ ব্যবহার হত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শ্রী বৃদ্ধির জন্যে। এখন এসবের অলিখিত মালিকানা দেশের ধনী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং আমলাতন্ত্রের হাতে। বন জঙ্গলের আদিবাসীদের এই প্রকৃতি তার সম্পদেরওপর কোন অধিকার নেই। এই সম্পদ দেশেরউন্নয়নএর জন্য ব্যবহার করার পূর্ণ ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তাই পরিবেশবিদদের সাবধানবাণী সত্ত্বেও যথেচ্ছ গাছকাটা হচ্ছে, নিঃশেষ করে দেওয়া হচ্ছে গ্রাম, অরণ্য এবং বাঁধের জন্যে শুকিয়ে যাচ্ছে নদী।

পঁচাত্তরে এসে ভালো কিছুই কি তাহলে বলার নেই! ভারতের মত একটি উপমহাদেশ যেখানে ভাষা, ভৌগলিক অবস্থান, পরিধান, লোক সংস্কৃতি, প্রকৃতি সব কিছুতে এত বৈচিত্র্য সেই দেশ,  যেএত বৈষম্য অসমতার মধ্যেও এখনও ঐক্য বজায় রেখে সার্বভৌম থাকতে পেরেছে এবং প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা গণতন্ত্র রক্ষার জন্যে লড়াই করে চলেছে, ৭৫ পদার্পণ উপলক্ষে এক সাথে গৌরবের অংশীদার হয়েছে, এও কম উল্লেখযোগ্য নয়। 

তাই পঁচাত্তরের সন্ধিক্ষণ আমাদের সুযোগ করে দিক আত্ম অনুসন্ধানের।

------------------------

অভিষেক রায় দেশে ও বিদেশে শিক্ষকতা করেছেন বেশ কিছু বছর। বিষয় ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য। বর্তমানে স্বাধীন গবেষক, লেখক ও অনুবাদক। সমাজ ও পরিবেশ আন্দোলনের সাথে যুক্ত।

উত্তরবঙ্গের হাতি আর মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান / স্বাতী রায় / ৩য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা

  উত্তরবঙ্গের হাতি আর   মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান স্বাতী রায় দৃশ্যটা প্রথম দেখেছিলাম উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক দূরে, উত্তরাখণ্ডের রাজাজী ...