রবিবার, ১১ জুন, ২০২৩

৩য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা - প্রচ্ছদ কাহিনী - ধানজীবন - সায়ন্তনী মহাপাত্র মুদী

 


ধানজীবন

সায়ন্তনী মহাপাত্র মুদী

মানুষে মানুষে দেখা হলে খালি সেই এক প্রশ্ন,  তোমার নাম
কি
? দেশ কোথা তোমার? হিন্দু তুমি, না মুসলমান? বাড়িখান ভাড়ার নাকি নিজের?"

কই কেউ কেন শুধোয়না- 'তুমি কোন সময়ের মানুষ বাছা?’ এ বুঝি ধরে নেবার জিনিস, যে এই সময়ে আছি বলে আমাকে এখনকারই মানুষ হতে হবে? এ ভারী অন্যায় কথা! এই সময়ে পা রেখে আমি বুঝি মনে মনে অন্য সময়ে বাঁচতে হতে পারিনা!

মানছ না তো!

আচ্ছা বেশ। তুমি বরং নিজের মনের মধ্যিখানেই একবার ডুব দিয়ে দ্যাখো। তোমার বুঝি সবসময় এই সময়টায় বাঁচতে ভালোলাগে? বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে যখন ফুটপাথের ইঁট পাতা উনুনে ভাত ফোটার গন্ধ আসে, গলির মুখের চায়ের দোকানে যখন কয়লার আগুনে টোস্ট সেঁকার ঘ্রান ওঠে, তোমার ইচ্ছে করে না এক ছুটে সেই সন্ধেগুলোয় ফিরে যেতে? যেখানে সিমেন্টের মেঝেতে আসন পেতে বসে গরম গরম চারা মাছের ঝোল দে ভাতের গরাস মুখে তুলে দিত কেউ?

আমরা সকলেই আসলে নিজের মনের মধ্যে আর একখান হারিয়ে যাওয়া সময় নিয়ে বাঁচি। চাইলেও তাকে না পারি ছুঁতে, না পারি ফিরে যেতে। কিন্তু তা বলে সে একটুও মিথ্যে নয়। এই যে আমাকেই দ্যাখো না কেন, আধুনিক এই সময়ে, এক আধুনিক শহরের বুকে দাঁড়িয়েও কেন জানি আমার মন পড়ে থাকে সেই খেতখামারের দেশে, মাটির উঠোনে, যেখানে বোশেখ থেকে পোষ - রোদ, বৃষ্টি আর শিশিরের পর্যাবৃত্ত অনুসরণ করে মানুষের জীবন আবর্তিত হয় জলকাদা মাখা চাষের খেতে।

পর্যাবৃত্ত, কী কঠিন একখান শব্দ না! এই পৃথিবীতে যা কিছু প্রাণবন্ত, যার শুরু আছে, তার শেষও আছে। আর এই শুরু আর শেষের মধ্যে থাকে পুরো একটা জীবন।

যেমন ধর চাল। তুমি বলবে এ আবার জীবন কোথায়! ধান ভেনে চাল আর চাল ফুটিয়ে ভাত, এই তো।

তা নয় গো তা নয়।

এই দেখতে সামান্য ধানেরও একটা ভারী সুন্দর একটা জীবনচক্র আছে, সে জীবনের যেমন এক অনিশ্চিত ছন্দ আছে তেমনি আছে একরাশ ভালোলাগা। তার খবর শুধু রাখে চাষিবাসী মানুষে। ভেবে দ্যাখো শুধু পেটের জ্বালা মেটায় বলে নয়, মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু, সুখে, দুঃখে, আনন্দে, সমস্ত শুভকাজে ধান আর চালের কি অপরিহার্য উপস্থিতি। শিশুর অন্নপ্রাশন, পুজোর নৈবেদ্য, আশীষের থালা, মেয়ের বিয়ের কনকাঞ্জলি থেকে মৃত্যুর পরের পিন্ডদান। ধান আর চাল ছাড়া সব যে মিছে। তা মানুষের জীবন চক্রের সাথে এত ওতপ্রোত সম্পর্ক যে শস্যের আজ না হয় তার জীবনটাই একবার ঘুরে দেখলাম।

দীঘির জলে টুপ টাপ হিজল খসার দিন শেষ হয়ে যখন বর্ষার কালো মেঘের ছায়া পড়ে, চাষি মানুষের ব্যস্ততাও ওমনি শুরু হয়। ওই দ্যাখো আকাশ পানে চেয়ে চেয়ে বলাই কাকা কেমন হাঁটা দিয়েছে মাঠের পানে। ওই ও পাড়ার দুলাল দাদাও কাকারে ডেকে সঙ্গে নিলো। আজ ওরা বীজতলার জমি তৈরী করবে। ক্যানেল থেকে খাল কেটে জল এনে কাদা কাদা করে, মই দিয়ে সমান করবে এক টুকরো জমি। তারপর কোনও এক বিষ্যুদবার, সকাল সকাল চান করে, গত পুজোর লালপাড় শাড়িখান গায়ে দিয়ে,  এক মাথা সিঁদুর পরে কাকী উঠোনের উনুন লেপে পায়ে সে রাঁধতে বসবে। সেই সুগন্ধি  'উকনিমধু' চালের পায়েস, তেলসিঁদুর, মঙ্গল ঘট আর শঙ্খধ্বনি দিয়ে মায়ের আবাহনের পরে শুরু হবে ধানের যাত্রা।

 

দুরুদুরু বুকে, মায়ের স্মরণ নিয়ে আঁকুর ধান ছড়িয়ে দেবে ওইখানিক জলজ মা জমিতে। মাটির আদর, জলের সিঞ্চন আর সূর্যের তাপে সেই বীজধান বড় হয়ে জলের বুকে সবুজ মখমলি কিংখাবের মতো ঝলমল করবে। দুপুরে শাপলার ঝোল দিয়ে ভাত মেখে নিতে নিতে বলাইকাকা মনে মনে হিসেব করবে কোন জমিতে কী ধান রুইবে। ওই পুবের ছটাক খানেক জমিতে 'জটাবাঁশফুল'.  বুড়ি মায়ের খাবার জন্য খুব সহজপাচ্য। মেয়েদের আবদার আগালিধান, বচ্ছরকার দিনে বাপের বাড়ি এসে দুধ ভাত খাবার এই আহ্লাদটুকু বাপেরে যে রাখতিই হয়, দক্ষিণের জমিতে সারা বছরের মুড়ির জোগাড়ের জন্য বেশ খানিকটা 'নারকেল ঝোপা', পিঠে পুলির জন্যি পশ্চিমের বিলের ধারের জমিতে খানিক 'কটকতারা' আর বাকি জমিতে সারা বছরের ভাতের যোগানের জন্য 'হিদি' . নিজের মনেই হেসে ফেলে বলাই কাকা। ঠাকমা যে ছড়া কাটতেন, "যদি না থাকে হিদি, গুষ্টি পেলব কিদি?" শুনে কাকীও কেমন হাসতে লেগেছে দ্যাখো। দেখে দুগ্গা দুগ্গা করতে লেগেছে বুড়ি শাশুড়ি, ছেলে বৌয়ের এই সোনাঝরা হাসি যেন সোনার ফসল হয়ে গোলায় ওঠে গো মা।

কিন্তু তার আগে যে মেলা কাজ। বৃষ্টি ভেজা মাটি লাঙ্গল চালিয়ে কতক উপর নীচ করা, বচ্ছরকার জমা করে রাখা সার গাদা টেনে রোদ খাওয়ানো, তারপর সেই সার জমিতে ছড়িয়ে মাটি সমান করে তাতে বর্ষার জল খাওয়ানো, ভাঙা আল বেঁধে মজবুত করা। তারপর কোনও এক সকালে কাকা, কাকী, ছেলে, বৌমা নেমে পড়বে মাঠের গোড়ালি ডোবা জলে। বীজতলা ভেঙে গোছা গোছা ধানের ছড়া খানিক জলের আদর খাবে। তারপর সারে সারে লাগানো হবে গোটা জমি জুড়ে।

তারপর? তারপর খালি ঘর আর বার, আকাশে মেঘের আর মাটিতে জলের আন্দাজ নেওয়া, দুরুদুরু বুকে ঠাকুরকে ডাকা আর অসীম অপেক্ষা।

নিজের ছন্দে শ্রাবন পেরিয়ে ভাদ্র পড়ে। রোদবৃষ্টির লুকোচুরির ফাঁকে সবুজ ধানের ক্ষেত কেমন এক শান্তির সবুজ গালচে পেতে রাখে। দুবাড়ি ভিক্ষে করার ফাঁকে নিমাই দাদু ওখানেই শুয়ে একটু জিরিয়ে নেয়। রোদ বৃষ্টি মাথায় করে আগাছা তোলা, সার দেওয়া, খাল কেটে জল আনা, আল সারানোর ফাঁকে ওসবের বালাই নাই আলতাফ মিয়াঁর!

 

তবুও ভাদ্রের অকাল ঝড়ে যখন আকাশ অন্ধকার করে বাদল নামে তখন ধানের ক্ষেতের ওপর ওই শনশন করে বয়ে যাওয়া ঝড় দেখে কেমন মাটি থেকে পা ওঠেনা আলতাফের। দূর থেকে সে দেখতে পায় কচি ধানের ডগায় শিহরণ তুলে ঝড় এগিয়ে আসছে, কী যে এক বিধ্বংসীরূপ সেই ঝড়ের! নরম সবুজ ধানের গাছগুলোরও সেকী অসীম দাপট। ঝড় যত বাড়ে পাল্লা দিয়ে বাড়ে তাদের এদিক ওদিক মাথা নাড়া। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সবুজ সমুদ্রে উত্তাল ঢেউ এর ফণা আছড়ে আছড়ে পড়ছে। দেখে বুকে বল পায় আলতাফ, তুফান আসুক কি বান, আল্লার কৃপায় এবার ধান ঠিক গোলায় উঠবে।

দেখতে দেখতে দুগ্গাপূজা আসে। যায়। পূজার শেষে মণ্ডপ যখন ভাঙা বাসরের মতো একলাটি নিশ্চুপে পড়ে থাকে, তখন কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে মাঠ ভেসে যায় কী এক মায়াময় জোছনায়। বড়ঠাকুর বাড়ির শাঁখের আওয়াজে তড়িঘড়ি উঠে বসে জটেশ্বর। ক্ষেতের পারে, বাঁশের মাচায় বসে মাঠ পাহারা দিতে দিতে কখন জানি চোখ লেগে গিয়েছিল। উঠে বসে, গায়ের দোলাইখান জড়িয়ে নেয় ভালো করে। নিশ্চুপ সেই রাতে, পরিষ্কার শুনতে পায় ধানের বুকে হিম পড়ার টুপটাপ আওয়াজ। চরাচরব্যাপী জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া মাঠের দিকে তাকিয়ে কেমন অবশ লাগে জটেশ্বরের। চাঁদের আলো বুঝি এত সাদা হয়! চোখ কচলায় জটেশ্বর। মনে হয় যেন বিশাল এক সাদা পাখির দুধ সাদা পাখা বেয়ে মুক্তোর মতো আলো গড়িয়ে পড়ছে ধানের বুকে, মাটিতে কার যেন পায়ের ছাপ মঙ্গলময় আল্পনা এঁকেই আবার হারিয়ে যায়। বারেবারে চোখ কচলায় জটেশ্বর, ধানের মাঠে এত জাদুও লুকিয়ে থাকে! 

 

ঢাকের বাদ্যির আওয়াজ কমতে না কমতেই এসে পড়বে নল সংক্রান্তি, ধানের সাধভক্ষণের দিন। আশ্বিনের শিশিরে, মাটির ভালোবাসায় আর মৌমাছির আনাগোনায় ধানের তখন বিয়েন ছেড়ে থোড় আসে, বুকে টলটল করে দুধ। খরায়, বন্যায় যে ধান মানুষরে আগলে আগলে রাখে সে যে ঘরের মেয়েরও বাড়া। গর্ভবতী মেয়ের কল্যাণে ওই দ্যাখো নিতাই পন্ডিত কেমন আদার বাদাড় ঘুরে জড়ো করতে লেগেছে কাঁচা হলুদ, আদা, নিম , ওল, কেঁউ, কেতকী আর কালমেঘের পাতা। লোহার হামান দিস্তায় ছেঁচে ওই দিয়ে তৈরি হবে 'বনজ', সৃষ্টির আদি কীটনাশক। কেটে রাখা নল গাছের মাথায় পাকুড় পাতায় মুড়ে এইসব ওষধি পুঁতে দিয়ে আসবে ধান জমির ঈশান কোণের মাটিতে।

পেঁপের খোলায় তেল ঢেলে বাতি ডোবাতে ডোবাতে বড় চোখ জ্বালা করে নিতাই পণ্ডিতের। গেল বছর এমনি সময়ে বাচ্চা বিয়োতে গিয়ে চলে গেলো ছোটমেয়েটা। মা মরা সেই নাতি আজকে মন উঠোনময় টুলটুল করে হাঁটে। ধুতির খুঁটে চোখের জল মুছে জোরে জোরে পন্ডিত বলে ওঠে, 'অশ্বিন যায় কার্তিক আসে, মা লক্ষ্মী গর্ভে বসে। 'শাঁখ , কংসাল , ঘন্টা ধ্বনি আর ধুপ ধুনোর ধোঁয়ায় পোয়াতি সেই মেয়ের মুখ আর ধানের গাছ সব কেমন এক লাগে। চোখের জলে ভেসে যেতে যেতে খেত খামার ঘুরে ঘুরে সে কেবল বলতেই থাকে-

“নল পড়লো ভুঁয়ে, যা শনি তুই উত্তর মুয়ে।

এতে আছে আদা, ধান হবে গাদা গাদা।

এতে আছে শুকতা , ধান হবে মনি মুক্তা। ...”

না কোনোভাবেই ছোট মেয়ের দশা যেন না হয় এই পোয়াতি ক্ষেতের। কেবল এক খোকা তো নয়, এর মুখ চেয়ে যে বাঁচে অনেক অনেক মানুষ।

দেখতে দেখতেই এসে পড়ে অঘ্রাণ মাস। শীত আস্তে আস্তে থাবা বসায় এলিয়ে থাকা মাটির ঘর বাড়িতে। মাঠময় সোনারঙা ধানে হিমেল হাওয়ার মাতামাতি, রোদের ছটায় হীরের মতো ঝিকিয়ে ওঠা রাতের শিশির- মাঠময় যেন মণি মাণিক্যেরই চাষ। চাষীর ঘরের পরমধন এবার মাঠ ছেড়ে গোলায় উঠবে। ঘরে ঘরে তোড়জোড় চলে মুঠ কাটার। অঘ্রানের সকালেই তাই দেখ বড় খোকা স্নান করে, সাদা ধুতি পরে, গন্ধ, চন্দন, বেলপাতা নিয়ে রওনা দিয়েছে মাঠের পানে। পাশে পাশে শাঁখে ফুঁ দিতে দিতে পিসি কইতে থাকে, "একটাও কথা যেন কইসনি বাপ্ আমার" . তাতে বড় খোকা বিরক্ত হলেও পিসির ভারী বয়েই গেছে। কে না জানে মুঠ কাটার সময় কথা কৈলে ঘরে অলক্ষ্মী আসে।

"ততো মার্গে তুসং প্রাপ্তে কেদারেশু ভবাসরে l

ধান্যস্যল বনং কুর্যাৎ সার্দ্ধ মুষ্টিদ্বয়ং শুচিঃ ll

গন্ধৈঃ পুষ্পৈশ্চ নৈবেদৈ ধূপৈশ্চ ধান্য বৃক্ষকান l

পুজয়িত্বা যথান্যায় ভিশানেল বনং চরেৎll

তত স্তন্মস্তকে কৃত্বাসম্মুখ্যং শীর্ষ কান্বিতম l

স্পৃষ্ঠান কিমপি ব্যাপি ব্রজেন্মৌনেন মন্দিরম্ ll

সপ্ত পদ্যাং ততঃ পাদং দত্বামুখ্য নিকেতনে l

প্রবিশ্চ স্থাপয়েত্তত্র পূর্বভাগে সুপুজিতম ll” (কৃষি পরাশর )

 

মাঠে পৌঁছে গঙ্গা জল ছিটিয়ে, ঈশান কোন থেকে আড়াই প্যাঁচে খোকা আড়াই মুষ্টি ধান কাটে। নামাবলীর ছোপ দেওয়া কাপড় পিসি আলতো হাতে এগিয়ে দেয়। ধানের ভারে ঝুলে থাকা সেই শীষ গোছা খোকা ভারী যত্নে মুড়ে নেয় সেই নতুন কাপড়ে। কাটা গাছের গোড়ায় সিঁদুর আর ফুল রেখে রওনা দেয় বাড়ির মুখে। তারপর বাড়ির দোরগোড়ায় বড়বৌ পাধুয়ে দিলে সাতপা হেঁটে সে ধানের গোছা মা লক্ষ্মীর আসনের পাশে রেখে পূজা করে। আজ চাষি বাড়ির বড় আনন্দের দিন। নতুন ফসল আর নবান্নের আনন্দ সকলের চোখে মুখে। কদিন এখন ঘরে ঘরে মেয়ে জামাইয়ের আসা যাওয়া, লঘু ধানের পিঠে পায়েস আর ফল পাকুড়, কদমা , মঠ , কাঁচা দুধ দিয়ে ভেজানো চাল মাখা 'নবান্ন' খাওয়ার নিমন্ত্রণ। বছরভর কী এক অনিশ্চিত সময়ের পরে আজ আশায় বুক বাঁধে চাষা। স্বপ্নে ভাসে নতুন চালের, নতুন ভাতের গন্ধে।

ঘরে ঘরে এখন সাজো সাজো রব। মুনিশ, বাগাল, ধানকাটা, ধান ঝাড়ার শব্দে ভারী হয়ে থাকে হেমন্তের নরম রোদ , বাতাসে ভাসে তুষের গন্ধ। ধান ঝেড়ে খামারে তুলতে পারলি যে গেরস্ত মানুষের শান্তি। তারপর ধান সিদ্ধ না হওয়া অব্দি খানিক হাতপা মেলে বসতে পারবে বৌ ঝিয়েরা। কিন্তু এখন যে তাদের একটুকনিও সময় নেইকো।

পৌষ মানেই চাষার ঘরে পৌষলক্ষীর আগমন। ঘর, খামার, উঠোন নিকিয়ে তকতকে করে রাখতে হয়। মা আসবেন তার জোগাড় চলে দিন ভর। ঘরে ঘরে এখন ঢেঁকিতে পাড় দেবার আওয়াজ আর গেরস্ত বৌয়ের আনন্দের গান -

"ও ধান ভান, ধান ভান রে , ঢেঁকিতে পাড় দিয়া

ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া

ও ধান ভানিয়া কিনুম শাড়ি, পিন্দা যাইমু বাপের বাড়ি

সোয়ামি যাইয়া লইয়া আইবো গরুর গাড়ি দিয়া। .."

 গান শুনতে শুনতে মুঠ কাটা ধানের গাছ পাকিয়ে চাষা তৈরী করে বাউনি। পোষলক্ষ্মীকে আদর, যত্নে ঘরে বেঁধে রাখার এ এক নিরলস প্ৰয়াস। সিন্দুক, আলমারি, ধানেরমরাই , দরোজার কড়া সব জায়গায় চাষা বাউনি বাঁধে আর মনে মনে বলে, এস মা আমার ঘরে এস (আউনী ), আমার ঘরে, গোলাঘরেরধানেমাবেঁধেবেঁধেবসতকোরো (বাউনি), দেখোমা- তোমার আশীর্বাদে আমার ঘরের সুখ শান্তি যেন অটুট থাকে (চাউনি)। চাষার সে প্রার্থনা বুঝি ধ্বনিত হয় বিশ্ব চরাচরের সমস্ত জনপদে।

আজ পোষসংক্রান্তির ভোরবেলায় ওই দেখো আলের পথে পথে ইন্দির ঠাকমা কেমন ছুটে ছুটে চলতে লেগেছে। বড্ড বকবকায় ঠাকমা তাই সবাই খানিক এড়িয়েই চলে কিন্তু ঠাকমার আল্পনা দেবার হাতখানি যে খাসা। নিজেদের উঠোন, মারাই ঠাকমার হাতের ছোয়ায় সাজিয়ে নেবে বলে আজ ঠাকমার খুব তোয়াজ। ওই ছুটে ছুটে এখনও পাড়ার সরকারবাড়ি যাবে আগে। বেটে রাখা আতপচালের গুঁড়োয়, নিকিয়ে রাখা উঠোনে ফুটিয়ে তুলবে মাঙ্গলিক নকশা। ধানের ছড়া, লক্ষীর চরণ, মঙ্গলঘট , লাঙ্গল, মরাই , মায়ের বাহন প্যাঁচা, ঢেঁকি , কুলো আর গেরস্ত বৌয়ের মনের সুপ্তবাসনা কানের দুল, গলার হার সব বুড়ির হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠবে একে একে। আর আঁকবে মালক্ষ্মীর পদচিহ্ন, বাহির দরজা থেকে উঠোন হয়ে ঠাকুরঘর পর্যন্ত। কোজাগরী রাতে দেখা জটেশ্বর এর সেই ছোট্ট ছোট্ট পায়ের ছাপ। আজ আর সেই ছাপ মিলিয়ে যায়না বরং চালের গোলা শুকিয়ে আরো প্রস্ফুটিত হয়ে ফুটে ওঠে মাটির বুকে। যারা বলছিলে ধান ভানিয়ে চাল আর চাল ফুটিয়ে ভাত, ভেবে দ্যাখো দিকি পেট ভরানোই যার কাজ সেই একশস্যের জীবনে, মানুষ জুড়ে দিয়েছে কত শ্রী।

সরকার বাড়ির ছোট খুকি বসে বসে ঠাকমার আল্পনা দেওয়া দেখে আর শুধায়, “আল্পনা কেন দেই আমরা ঠাকমা? " টনটন করা পিঠ খানিক সোজা করে ঠাকমা বলে, “খানিক মালক্ষ্মীর জন্য ঘরদোর সাজাই আমরা দিদিভাই। আর মনুষ্যেতর জীবের সঙ্গে এভাবেই ভাগ করে নেই আমাদের আনন্দের ফসল। এই যে চালের গোলার আল্পনা, এই খেয়ে বাঁচবে ছোট ছোট কীটপতঙ্গ। রাতে পূজার পরে বাঁশবাগানে খাবার রেখে আসা হবে কুকুর, শেয়াল, কাক, পাখি এদের জন্য। উনুনের পায়েস পিঠা বিলানো হবে ঘরে ঘরে। খিদে কি কেবল আমাদের একার দিদি? যে খিদে আমার পেটে জ্বালা ধরায়, সে আগুন জ্বলে বিশ্বের সবার পেটে।  'আমার যে ক্ষুধা , সে যে বিশ্বেরও ক্ষুধা ' (ব্রম্ভ বান্ধব উপাধ্যায়) উৎসর্গ, নিবেদন , অর্পণ না থাকলি যে মানুষ পশু হয়ে যাবে দিদিভাই।“

 

ছোট মেয়ে সে, কি বুঝলো তা সেই জানে। বুড়ি শুধু আশায় বুক বাঁধে ধানের জীবনচর্যা অনুসরণ করে বড় হয়ে ওঠা এই মেয়েও একদিন সকলেরে বেঁধে বেঁধে থাকতি শিখবে।

কিন্তু বুড়ি কি আর জানে এই মেয়ে বড় হতে হতে এই পৃথিবী কতখানি বদলে যাবে! কোনও বলাই কাকারে আর হিসেবে কষতে হবে না বিঘা প্রতি মুড়ির ধান, পান্তার ধান, পার্বনের ধানের। নল সংক্রান্তির ভেষজের খবর রাখবেনা কোনো নিতাই পণ্ডিত, না বড় খোকা অঘ্রানের ভোরে চান করে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে মাঠে যাবে মুঠ কাটতে। খালি কোথাও নতুন ধান উঠলে পৌষের সন্ধেয় জন্মান্তরের চাষবাসের ইতিহাস ঘাই মারবে রক্তে। নীলটালির রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সেদিন মেয়েটারও খুব ইচ্ছে হবে একটু চাল গুলে ঠাকমার মতো আল্পনা দিতে। চালের গুঁড়ো, নারকেলের ছাই, নতুন গুড় দিয়ে মায়ের মতো পিঠে গড়ে সবার ঘরে পাঠাতে।

পারবে কি মেয়েটা? এর উত্তর জানে কেবল সময়।

কিন্তু আজকের এই ব্যস্ত জীবনে, হারিয়ে যাওয়া সেই সময়ের খোঁজ রাখে কোন জনে ?

 

হেমকণা পায়েস

(প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর আমিষ ও নিরামিষ আহার )

 

উপকরণ:

ডেলা ক্ষীর বা মেওয়া : ৬০ গ্রাম

আমন্ড বা কাজু বাদাম : ১৫ গ্রাম

চালের গুঁড়ো : ৩০ গ্রাম

জাফরান : এক চিমটি

দুধ : .৫ লিটার

চিনি : ১২৫ গ্রাম

পেস্তা পরিবেশনের জন্য

 

পদ্ধতি :

বাদাম ভিজিয়ে রেখে খোসা ছাড়িয়ে মিহি করে বেটে নিন। মেওয়া কুরিয়ে নিয়ে ওর সঙ্গে মাখুন। চিনি মেশান,  একটু করে চালের গুঁড়ো মিশিয়ে মিশিয়ে ময়দা মাখার মতো করে শক্ত করে মাখুন। ঢাকা দিয়ে রাখুন ১৫ মিনিট। তারপর মটরশুঁটির দানার মাপে ছোট ছোট দানা কেটে মসৃন করে গুলি পাকান।

 

তলা ভারী পাত্রে দুধ ফুটিয়ে ঘন করুন। ওতে জাফরান মেশান। ২০-২৫ মিনিট পরে দুধ বেশ ঘন হলে আঁচ বন্ধ করে চিনি মেশান। চিনি গলে গেলে হেমকণার দানা গুলো মেশান। এই পর্যায়ে বেশি নাড়বেন না।

সাধারণ তাপমাত্রায় এনে, পেস্তার টুকরো ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

 -------------------------------------------------------------

সায়ন্তনী মহাপাত্র মুদী বিশ্বভারতীর ছাত্রী।

বাংলার রন্ধন সংস্কৃতি নিয়ে সতত চর্চায় নিয়োজিত। নিজেও একজন রন্ধনশিল্পী।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

উত্তরবঙ্গের হাতি আর মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান / স্বাতী রায় / ৩য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা

  উত্তরবঙ্গের হাতি আর   মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান স্বাতী রায় দৃশ্যটা প্রথম দেখেছিলাম উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক দূরে, উত্তরাখণ্ডের রাজাজী ...