ব্র্যান্ড নিয়ে কিছু অগোছালো কথা
শুভেন্দু দাশগুপ্ত
‘ব্র্যান্ডনেম’ কথাটি প্রধানতঃ বাজার, পণ্য, উৎপাদন, পুঁজি, মুনাফা এই সবের সাথে জড়িয়ে আছে। আমি একটা জিনিস চাই, আমার দরকার, সেখান থেকে আমার চাহিদা তৈরি হয়, আমি কিনি। আমি কিনি তাই উৎপাদন হয়। অন্য দিক থেকেও হয়, এখন অন্য দিক থেকেই বেশি হয়। পুঁজির মালিক পুঁজি বাড়াতে চায়, পুঁজি বাড়াবার জন্য পুঁজি বিনিয়োগ করে উৎপাদনে, উৎপাদনে যে পণ্য তৈরি হল তা বিক্রি করতে চায়, কারণ তাকে বিনিয়োগ করা পুঁজি আর মুনাফা ফেরত পেতে হবে।
পণ্য বিক্রি করার নানা উপায় আছে। যেমন বিজ্ঞাপনের মধ্যে দিয়ে চাহিদা তৈরি করা - চাহিদা তৈরি হলে পণ্য বিক্রি হবে। এই চাহিদা তৈরির একটা উপায় হচ্ছে ‘ব্র্যান্ড নেম’ বানানো। ধরা যাক খুব কাছের একটা উদাহরণ।
আমার জুতো দরকার। অনেকেই জুতো বানায়, আমি যে কোন একটা জুতর দোকানে গিয়ে জুতো কিনতেই পারি। দোকানদার নানা কোম্পানির জুতো আমাকে দেখাবে, আমি তার কাছ থেকে একটা বেছে নেব। এই বেছে নেওয়ার নানা মাপকাঠি। জুতোর দাম, পরে আরাম পাওয়া, দেখতে ভালো, কাজের। এমন একটা খোলামেলা বাজারে এল ‘বাটা’। জুতো বানানোর কোম্পানি বাটা। বাটা এসে যেটা করল, জুতো বিক্রি করলনা, ‘বাটার জুতো’ বিক্রি করল। বিজ্ঞাপনের মধ্যে দিয়ে, নানাধরণের প্রচার ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে ‘জুতো’ কে করে তুলল ‘বাটার জুতো’। আমরা তখন জুতো কিনতে গেলাম না , ’বাটার জুতো’ কিনতে গেলাম। এটাই শুরুর কথায় ‘ব্র্যান্ড নেম’।
বাটা কোম্পানি বোঝাল বাটার জুতো অন্য কোম্পানির জুতো, অন্য জুতোর থেকে আলাদা। আমরা কিভাবে বিচার করব? বিচারের বদলে আমরা ‘বিশ্বাস’ করলাম, মেনে নিলাম। এটাই ব্র্যান্ড নেমের কাজ – বিশ্বাস করানো, মেনে নেওয়ানো। এবং একবার একটা পন্যে ব্র্যান্ড নেম মেনে নিলে তার পাশাআশি অন্য পন্য মেনে নেওয়া। বাটার মোজা, ফিতে, জুতোর কালি, ব্রাশ।
মেনে নিলাম কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব কঠিন। আমরা মেনে নিই নানা কারণে।
বাটার জুতোর উদাহরণেই ফিরে আসা যাক। বড় দোকান, সাজানো দোকান, আলো ঝলমলে, অনেক জায়গায় দোকান, খরিদ্দারকে খাতির করা। আর অনন্তর বিজ্ঞাপন দিয়ে যাওয়া, যে ভাবে পারা যায়, যেখানে পারা যায়, আমার মনের মধ্যে গেঁথে দেওয়া ‘জুতো’ বলে কিছু হয় না, জুতো মানেই ‘বাটার জুতো’।
বাটার জুতোর বেলায় যা যা বললাম, কোকাকোলার ব্যাপারটা তা নয়। ‘কোকাকোলা’ পৃথিবী বিখ্যাত ব্র্যান্ড। আমরা দোকানে গিয়ে বলিনা একটা কোল্ড ড্রিংক দিন, বলি একটা ‘কোকাকোলা’ দিন। ‘কোকাকোলা’ ব্র্যান্ড নেম তৈরি করল বাটার জুতোর মত নিজেদের দোকান সাজিয়ে নয়। কোকাকোলার নিজের নামে কোন দোকান নেই। পাড়ার ছোট দোকান থেকে বড় রেস্টুরেন্ট সব জায়গায় কোকাকলা। ঠান্ডা পানীয় মানেই ‘কোকাকোলা’। যে কোন জায়গায় যেকোনলোকের কাছে যে কোন সময়ে যে কোন অনুষ্ঠানে। এই যে সবার কাছে সবসময় পৌঁছে যাওয়া, এটাই কোকাকলার ব্র্যান্ড নেম। এই ব্র্যান্ড নেমের আবার অন্য একটা দিক আছে। ‘কোকাকোলা’ আমেরিকার কোম্পানি। আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সারা পৃথিবী জুড়ে ‘কোকাকোলা’র বাজার, বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য। কার্টুনে, পোস্টারে, প্রতিবাদী কথায়, আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিবাদ কথায়, ছবিতে -কোকাকলাকে এঁকে ফেলা হয়।
একটা উদাহরণ দিই। আফ্রিকার একটা দেশ, তাদের একটা মিউজিয়াম। সেখানে আমেরিকাকে পরিচিত করানো নানা বস্তুচিহ্ন দিয়ে। আর সেখানে সাজানো ‘কোকাকোলা’র একটা বোতল। আমেরিকার চিহ্ন, ব্যঙ্গ করে দেখান - আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের প্রতিবাদে।
অন্য ভাবেও এই ব্র্যান্ডনেমটা কাজে লাগান হয়। একবার হওয়ার সাক্ষী আমি। তখন আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করেছে। কলকাতায় এই আক্রমণের বিরূদ্ধে নানা আন্দোলন চলছে। মেটিয়াবুরুজে থাকা আমার বন্ধুরা আমেরিকার পণ্যের বিরূদ্ধে আন্দোলন করছে। আমাকে বলা হল ভারতের বাজারে থাকা এবং মুদী ও মনোহারী দোকানে বিক্রি হওয়া আমেরিকার কোম্পানিদের পণ্যের একটা তালিকা বানিয়ে দিতে। আমি যতটা জানি বানিয়ে দিলাম। একটা পণ্যের বিরোধিতা আমার তালিকা বানানোর আগেই শুরু হয়ে গেল সেটা ‘কোকাকোলা’। মেটিয়াবুরুজের দোকানে দোকানে আন্দোলনকারীদের অনুরোধে দোকানীরা ‘কোকাকোলা’ বিক্রি বন্ধ করে দেয়। ‘কোকাকোলা’ তখন প্রতিবাদী আন্দোলনের লক্ষ্য ব্র্যান্ড নেম। একটা ব্যক্তিগত কথা বলি – আমি সেই যে ‘কোকাকোলা’ খাওয়া বন্ধ করেছিলাম, এখনও খাইনা। অন্ততঃ একটা ব্র্যান্ডনেমের খপ্পর থেকে বেরোতে পেরেছি।
যা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেখানে ফিরে যাই।
ব্র্যান্ড নেম বানানো হয়, একটি পণ্য উৎপাদন সংস্থা বানায়। ব্র্যান্ড নেম বানানোটা নিছক একটা পণ্য কেনানো নয়। একবার বাটার দোকানে গিয়ে জুতো কিনে বাড়ি ফিরে আসা নয়। ব্র্যান্ড নেম তোমাকে জড়িয়ে ধরে। তোমার অস্তিত্বের সাথে, তোমার চলা ফেরা জীবন যাপন, তোমার সাথে থাকার চিহ্ন হয়ে উঠতে চায়।
বাটার জুতোতে বড় করে ’বাটা’ লেখা থাকত না। এবার জুতো কোম্পানি নাইকে, এডিডাস, পুমা নিজেদের ব্র্যান্ডনেমটা আমাদের শরীরে লিখে রাখলো। জুতোর গায়ে বড় বড় করে তাদের নাম কিম্বা চিহ্ন সেঁটে দেওয়া হল। আমি সেই বড় বড় নাম ছবি লেখা সহ জুতো পরে সারাদিন ঘুরে বেড়ালাম। সবাইকে দেখালাম আমি নাইকের জুতো পরেছি। আমি তোমাদের থেকে আলাদা। অন্যরাও তাই ভাবল। ওরে বাবা! এডিডাসের জুতো পরেছে। আমি গর্বিত হলাম, স্বীকৃত হলাম, নিছক একটি পণ্যের একটি নাম চিহ্নের মধ্যে দিয়ে। আমি খেয়াল করলাম না, আমি একটি ব্র্যান্ড নেমের চলমান বিজ্ঞাপন হয়ে গেলাম। একটাও পয়সা না পেয়ে বিক্রিও বাড়িয়ে দিলাম। আমাকে দেখে একজন, তাকে দেখে আরেকজন এইভাবে। এভাবেই টি-শার্টের বুকে এডিডাস, মোজায় পুমা, টুপির সামনে নাইকে। ব্র্যান্ডনেমে আমাকে সাজিয়ে দিল বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড করে। আমার মুগ্ধতার মধ্যে দিয়ে আমি ব্র্যান্ডনেমের অধীনস্ত হয়ে গেলাম।
ক্ষমতা থাকলে ক্ষমতাকে ভেঙ্গে ফেলাও থাকে। অন্তর্ঘাত। ব্র্যান্ড নেমের অন্তর্ঘাত হয়। ছোট ছোট টি-শার্ট নির্মাতারা তাদের পন্যের গায়ে নাইকে, এডিডাস, পুমা লিখে সস্তা দামে নিম্নবিত্ত ক্রেতাদের কাছে নিয়ে এল। নিম্নবিত্ত ক্রেতা কিনল। তার ইচ্ছে পূরণ হল। সে ব্র্যান্ড নেম লাগানো কোম্পানির পণ্যের, পণ্য ব্যাবহারের, মুনাফার একচেটিয়াপনা ভেঙ্গে দিল। দেখাল আমরাও এমন ব্র্যান্ডনেমের পণ্য ব্যবহার করতে পারি।
তবে অন্তর্ঘাত সবসময় রাজনৈতিক হবে তার কোন মানে নেই। নকল ব্র্যান্ড নেমের টি-শার্ট পরে নিম্নবিত্ত ব্র্যান্ডনেম ব্যাবহারের আধিপত্যকে ভাঙতে পারল না, ব্র্যান্ডনেমের শিকারই থেকে গেল।
অনেক সময় ব্র্যান্ড নেম একদল ক্রেতাকে নয়, পুরো পণ্যটাকেই দখল করে ফেলে। বহুদিন পর্যন্ত ক্রেতারা দোকানে গিয়ে যে কোন বনস্পতি ঘি কিনতে গিয়ে ‘ডালডা’ ই চাইত, ব্র্যান্ড নেমের দাপাদাপিতে ক্রেতারা জানতই না সব বনস্পতি ঘি-এর নাম ডালডা নয়, অন্য নামেরও এই পণ্য আছে।
কোন কোন সময় পণ্যের নাম নয়, পণ্য বানানো কোম্পানিই ব্র্যান্ডনেম হয়ে ওঠে। ‘টাটা’। টাটা নামে ইস্পাত হয়, টাটা নামে কম দামের চা হয় – টাটা টি। এখানে পণ্য নয়, কোম্পানিই ব্র্যান্ড নেম। এর আগে একটা বিশ্বাস তৈরি করতে হয়। টাটা খুব বড় একটা কোম্পানি। অনেক কিছু বানায়। ভালো বানায়। এতবড় কোম্পানি খারাপ বানাবে কি করে। বিচার ছাড়াই বিশ্বাস তৈরি করা। টাটা যা বানায় তাই ভালো। ভালো হবেই। বিশ্বাসে কেনা। কী করে টাটা নামটা, ব্র্যান্ডনেমটা এমন বিশ্বাস বানাল? ঠিক জানি না। আন্দাজে বলতে পারি। খানিকটা ইতিহাস, সাহেবী আমলে একজন ভারতীয় জামশেদজী টাটা ইস্পাত কারখানার মত বড় একটা কারখানা বানিয়েছিল, মুগ্ধতা। টাটার নামে জায়গা টাটানগর। একজনের নামে প্রায় একটা আধা শহর – মুগ্ধতা! প্রতিবছর টাটার জন্মদিনে খবরের কাগজে এক পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে টাটার মাহাত্ম্য প্রকাশ। স্বাধীন ভারতে স্বদেশী শিল্প অর্থনীতি বানানোয় টাটাকে নিয়ে গল্পকথা। মুগ্ধতা। এমন ভাবে টুকরো টুকরো এটা সেটা জুড়ে জুড়ে একটা ব্র্যান্ডনেম তৈরি হয়ে যায়, তৈরি করা হয়। সুতরাং টাটার তৈরি চা ‘নিশ্চয়ই’ ভাল হবে।
এখানে একটা কথা মাথায় রাখতে হবে। কখন কিভাবে কোনটা ব্র্যান্ডনেম হয়ে যাবে, তার নিছক একটা বা দুটো নিয়ম নেই, পথ নেই। টাটা জিনিস বানিয়ে স্বচ্ছল ক্রেতাদের জন্য শুধু ব্র্যান্ডনেম বানাল না, টাটা টির চা নিম্নবিত্ত ঘরের জন্য। ব্র্যান্ডনেম বানিয়ে কে কোন জায়গাটা ধরতে চায়, কেন ওই জায়গাটা ধরতে চায়, সে অন্য কথা। আর সবটা আমরা জানাও নেই।
শুধু অর্থনীতি কেন, রাজনীতিও ব্র্যান্ড নেম বানায়। কোন একটা রাজনৈতিক দল তার রাজনীতির মতের যত না প্রচার করেন, তার চেয়ে কিছু কম প্রচার করে না তাদের নেতাকে, নেতার নামকে।
দুটি উদাহরণ দিই। একটা তো সাম্প্রতিক। সবাই মিলে একজন রাজনীতিক নেতার মুখোশ পরে সভায় আসা। রাজনীতিক কর্মী, মিছিলে হাঁটা, সভায় আসা রাজনীতিক কর্মীদের আলাদা আলাদা কোন মুখ নেই। সবার একটাই মুখ। নেতার মুখ। ব্র্যান্ডনেম। অন্য একটা উদাহরণ দিই। একটি রাজনীতিক দলের সভা। পোস্টারে দলের নেতা বক্তাদের নাম ছাপা হয়েছে পর পর। সবার নাম সমান মাপের হরফে নয়। একজনের নাম সবচেয়ে বড় হরফে সবার ওপরে। তিনি পার্টির ব্র্যান্ডনেম। একজন নেতার ব্র্যান্ডনেম পার্টিকে ছাপিয়ে উপরে উঠে যায়।
যারা এই লেখাটা এতক্ষন ধরে, ধৈর্য ধরে, একটুও বিরক্ত না হয়ে, মাঝপথে বন্ধ করে না দিয়ে পড়ে চলেছেন, তাদেরকে আরও খানিকটা ব্র্যান্ড নেমের কথার পথে হাঁটতে উসকে দিই।
ব্র্যান্ডনেম আমাদের সবার কথার মধ্যে কোননা কোনও ভাবে রয়ে গেছে। আমরা ধরতে পারি বা নাপারি। ‘ও তুমি ও বাড়ির ছেলে, তাইবল!’ ছেলের গায়ে অমুক বাড়ির ব্র্যান্ডনেম। ‘তোর কবিতা ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, বাঃ। কবিতা নয়, কবিতার গায়ে দেশ পত্রিকার ব্র্যান্ড নেম লাগান।
নিজের জীবনের এমন একটা ব্র্যান্ডনেমের কথা বলি। আমি পড়তে চেয়েছিলাম বাংলা অনার্স। আমরা উদ্বাস্তু পরিবার। টাকা পয়সা ছিল না। বাবা আগেই চলে গেছেন। দাদার ঘাড়ে সংসার। বলল ‘বাংলা পড়লে খেতে পাবি না। এমন কিছু পড় যাতে চাকরি পেতে পারিস। ঠাকুরপুকুর কলেজে ইকনমিক্স অনার্স খুলেছে। সুধীন বলছিল তোকে সেখানে ভর্তি হতে। ’ সুধীনদা দাদার বন্ধু। ঠাকুরপুকুর কলেজে বাংলা অধ্যাপক। পরে আমার বিষয়ে আর কিছু জানার দরকার পড়েনি। ইকনমিক্সের ব্র্যান্ড নেম আমাকে না বিচার করেই এগিয়ে দিয়েছে। এ বিষয়ে আর একটু এগোই। অর্থনীতির জ্ঞান চর্চার জগতে দুটি বিখ্যাত নাম রয়েছে। এদের একজনের সাথে আমি একবছর গবেষণা সহায়ক হিসাবে কাজ করেছি, আর একজনের কাছে আমি গবেষণা করেছি। পরবর্তীকালে আমার বিষয়ে কিছু বিচার করার আগেই এই দুজন বিখ্যাত মানুষের নাম আমার নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছে। এই দুজন মানুষ নিজেদের ব্র্যান্ডনেম বানাননি। অন্যরা বানিয়ে দিয়েছেন।
ব্র্যান্ডনেম আমরাও বানিয়েছি, যারা ক্ষমাতাসীনদের বিপরীতে আছি, থাকতে চাই। কথা দিচ্ছি দুটির বেশি উদাহরণ দেবনা।
আমি তখন একটা গবেষনার কাজে বোম্বেতে। হিন্দুস্তান লিভারের শ্রমিক ইউনিয়ন একটা জানার বিষয়ে আমার সাহায্য চেয়েছিল। আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে তাঁরা শুনেছিল আমার গবেষনার বিষয় বহুজাতিক সংস্থা। ইউনিয়ন জানতে চেয়েছিল তাদের ভারতে থাকা হিন্দুস্তান লিভারের সঙ্গে বিদেশে থাকা মূল কোম্পানি ইউনিলিভারের সম্পর্কটা কী? ওদের সাথে আলোচনা হত। সেই আলোচনা থেকে জেনেছিলাম হিন্দুস্তান লিভারের শ্রমিকরা তাদের ধর্মঘটের সময় কোম্পানির বাইরে সাবান বানিয়ে (কম্পানিতে ওদের ‘সানলাইট’ সাবান বানাতে হত) ধর্মঘটের জন্য টাকা তোলার দরকারে বোম্বের লোকাল ট্রেনের স্টেশনে স্টেশনে বিক্রি করত। সাবানের নাম দেয় ‘স্ট্রাইক’। ব্র্যান্ড নেম। এই নামটা খুব কাজে দেয়। যাত্রীরা সাবানটা কেনে। সাবানটার জন্য নয়, নামটার জন্য। সাবান কেনার মধ্যে দিয়ে, এই ব্র্যান্ড নেমটা মেনে নেবার মধ্যে দিয়ে যাত্রীরা শ্রমিকদের পাশে, পুঁজি মালিকের বিরূদ্ধে শ্রমিকদের ধর্মঘটের পাশে দাঁড়িয়ে যায়।
এই ঘটনা থেকে উদাহরণ নিয়ে আমরা এই এখন একটা ব্র্যান্ড নেম বানানোর উদ্যোগ নিই। এখন এই করোনা পরবর্তী সময়ে গ্রাম মফঃস্বল ছোট শহরে অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। একটি ছোট শহরে থাকা আমার বন্ধুরা যারা ‘কিছু একটা করা যাক’ এমন উদ্যোগে নেমেছে। এমনভাবে শুরু করা হয়। ছোট শহরে, ছোট ক্রেতা, ছোট বিক্রেতা, ছোট উৎপাদক রয়েছে। প্রথমে ছোট ক্রেতাদের কাছে যাওয়া, জিজ্ঞাসা করা তাঁরা এখনও কি কি জিনিস কিনছে যা না কিনলেই নয়। তারপর তাদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া এই জিনিসগুলি যদি এখনকার ছোট উৎপাদকরা বানায়, তাদের মদত দেওয়ার জন্য তাঁরা কিনবে কিনা। যা কিনবে বলে জানাবে তার একটা তালিকা বানানো হয়। সেটা ছোট বিক্রেতাকে বলা হল তাদের দোকানে এই পণ্য গুলো রাখতে।
এমন ভাবে বানানো, বিক্রি করা, কেনা পণ্যের নাম হোক একটা অন্য রকম কিছু। ‘আমাদের জিনিস’ ‘বাঁচার লড়াই’ ‘সংগ্রাম’ এমন ধরণের একটা কিছু, যাতে করে যারা এই বানানো, বিক্রি করা, কেনার পাশে রইলেন তাঁরা বুঝতে পারেন অন্যরকম একটা কিছু করলেন। একটা ব্র্যান্ড নেম বানালেন। অন্যরকম ব্র্যান্ড নেম। একটা রাজনীতিক অর্থনীতি।
এবার থামা যাক। যে কেউ বলে দিতে পারেন, লেখক ব্র্যান্ড নেম নিয়ে লেখার ব্র্যান্ড নেম হয়ে উঠতে চাইছেন। আর খুব খুশি হব এই ব্র্যান্ড নেম হয়ে ওঠার চেষ্টাটিকেই যদি ভেঙ্গে দেন। যারা পড়লেন তাঁরা যদি মতামত জানান প্রশ্ন করেন, তক্কো করেন, ভুল ধরিয়ে দেন তাহলে একটা সুযোগ থাকবে কথা বলাবলির। এখন তো আলোচনাতে কথা বলাবলি হয় না। শুধুই কথা বলা হয়। ‘হোয়াটস অ্যাপ’ এখন কথা বলার কথা লেখার জায়গার ব্র্যান্ড নেম হয়ে উঠেছে। গতকাল বিষয় ১ তো আজ বিষয় ২, আগামী কাল বিষয় ৩। বিষয় ১ নিয়ে ভাবা , কথা বলা, তর্ক করা বন্ধ করে দেওয়া। আর তাই চাইছে ‘হোয়াটস অ্যাপ’- ভাবনার ব্র্যান্ডনেমটি। কতটা ক্ষতি হল, হচ্ছে আমরা বোধহয় এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। বুঝে উঠতে পারাটা খুব জরুরী দরকার।
আমার লেখা মেনে নেবেন না। তুমুল তর্ক করুন। আমরা আবার লাগাতার আলোচনায়, তর্কে ফিরে আসি। দু’লাইন বা দু’প্যারাগ্রাফে নয়। ভাবনায় ফিরে আসি, ভাবতে বসি, পড়তে বসি, চিন্তা করি, অমত হই।
মগজের ভূমিতে কাউকে ‘ব্র্যান্ডনেম’ হয়ে যেতে দেবেন না। অন্ততঃ এই একটা জায়গা আমাদের জন্য রেখে দিন।
ভালো থাকবেন।
-----------------------------------
শুভেন্দু দাশগুপ্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রাক্তন অধ্যাপক। কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় প্রান্তিক অর্থনীতি নিয়ে তাঁর অসংখ্য গবেষণা। শুভেন্দুবাবু নানা বিকল্প পথের ও গন্তব্যের সন্ধানী। সেই সূত্রে অন্য সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গেও তাঁর ওঠাবসা।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন