ঘোড়ার লাগাম বিষয়ক আলাপচারিতা
অংশুমান দাশ
এই যে আমি বাজার যাচ্ছি, ঢ্যাঁড়শ কিনছি – মানে এখনও কিনতে পারছি, বাজারে ঢ্যাঁড়শ আসছে, আমার মানি ব্যাগে টাকা আছে – এতেই তো দিব্যি বোঝা যাচ্ছে অর্থনীতি গড়গড়িয়ে চলছে। তাই না?
চলছে? সত্যি নাকি? তোমার চলছে মানেই আমার চলছে এটা একটু সরলীকরণ হয়ে গেল না? জানো তো ভারতের ৬৭কোটি মিলিয়ন লোক দিনে ৪০ টাকার নীচে দিন চালায়? ভারতে রোজগারের স্কেলে উপরের দিকের ১ শতাংশ মানুষ ৫৮.৪% সম্পদের দখলদার আর নীচের দিকের ৫০ শতাংশের কাছে পড়ে আছে মোট সম্পদের ২.১ শতাংশ। তুমি চারপাশে যা দেখছ সেটা তোমার দেখার পরিধি – তার বাইরে কি পৃথিবী নেই? ক্যালরি দিয়ে মাপলে এখন পৃথিবীতে দিনপ্রতি চাহিদার দ্বিগুণ ক্যালরি উৎপাদন হয় – আবার তার পাশে ৮৫ কোটি ক্ষুধার্ত মানুষ। এইরকম বৈষম্য তৈরি করে রেখেছি আমরা মানুষে মানুষে দেশে দেশে গোলার্ধে গোলার্ধে – আর তুমি বলছ চলছে? হ্যাঁ একথা ঠিক, চীন আর ভারতের মত দেশ বহু মানুষকে একদম হতদরিদ্র অবস্থা থেকে বাইরে নিয়ে এসেছে – সরকারি অনুদানের দাক্ষিণ্যে। কিন্তু সেই সঙ্গে বৈষম্যও বেড়েছে আকাশছোঁয়া। ওই আবার দেখ, উপরের দিকের ১০ শতাংশ মানুষের সম্পদের শেয়ার ২০১০-এ ৬৮.৮ শতাংশ থেকে ২০১৬ তে বেড়ে হয়েছে ৮০.৭ শতাংশ। সুতরাং এই যে বাজার থেকে ঢ্যাঁড়শ কেনার সহজ অর্থনীতি, এটা স্রেফ একটা মস্ত ভাঁওতার উপরে দাঁড়িয়ে। ভাঁওতাটা হচ্ছে - যে দেশের যত বড় অর্থনীতি, সেই দেশ তত উন্নত – তাই নয়-দশ-এগার এমনি করে বারো– বাড়তেই থাকো। দেশের ক্ষেত্রে যেমন – সেটা একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তাই – আরও পয়সা, আরও উন্নতি। আরে মশাই – কত বাড়বেন?
সেই, বাড়ার কি আর শেষ আছে!
শেষ তো থাকতেই হবে – পৃথিবী তো আর প্রতিদিন বেড়ে বেড়ে যাচ্ছে না। তার সম্পদ তো নির্দিষ্ট। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানতো ওই জমি থেকেই আসতে হবে। আর জমির জন্য তোমার পিট লেগেই আছে – সে কথাও নতুন নয়। একটা জটিল অংক বুঝে নেওয়া যাক। পৃথিবীর ৩১ শতাংশ জমি চাষযোগ্য – ১১% (১৫০ কোটি হেক্টর)-এ এখন চাষ হয়। হিসেব মত ৪০ লক্ষ হেক্টর মত জমি প্রতি বছর নতুন করে চাষের আওতায় আনতে হবে বেড়ে ওঠা জনসংখ্যাকে মাথায় রেখে। প্রায় একই জমি প্রতি বছর লাগবে বায়োফুয়েলের জন্য, ৩০ লক্ষ হেক্টর জমি প্রতি বছর চলে যাচ্ছে শহরায়নের দখলে, ২৫ লক্ষ হেক্টর প্রতি বছর যাচ্ছে ইন্ডাস্ট্রির জন্য জঙ্গল তৈরি করতে যাতে কাগজ আর কাঠ পাওয়া যায়, প্রতি বছর ২৫ লক্ষ হেক্টর জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে প্রতি বছর ১ কোটি ৬০ লক্ষ মিলিয়ন হেক্টর নতুন জমির দরকার। এই হিসেবে চললে ২০৫০-এর মধ্যে জল আর তেলের সঙ্গে আমাদের জমিও শেষ। এখনও পর্যন্ত জমির এই বলিদানের পরিবর্তে কোনমতে ভুলভাল খাবার উৎপাদন করে পৃথিবীর চলছে। চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
দাঁড়াও, মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। তার মানে তুমি বলছ সম্পদ যেমন অনিয়ন্ত্রিত ভাবে ব্যবহার হতে পারে না, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বাড়তেও পারেনা? তার মানে আমাদের সভ্যতা সেই সাপের নিজের লেজ খাওয়ার মত? খেতে খেতে সাপটাই ভ্যানিশ? তার মানে তুমি বলছ আমাদের একটা অবিচল স্থিতিশীল অবস্থার কথা ভাবতে হবে – যেখানে আমাদের সার্বিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধি থেমে যাবে?
বাঃ, একবারে ধরে ফেলেছ –কী খাচ্ছ বল তো আজকাল? এক চান্সে একবারে আসল জায়গায় এসে গেলে? আদতে আমাদের শুধু এখনকার অর্থনীতির আকারটুকু বজায় রাখতে হবে আর এবং আরও বৃদ্ধির কি করে হবে সেই চিন্তায় আপাতত লাগাম দিতে হবে। বরং মূলটা বজায় রেখে ভিতরে ভিতরে ব্যাপারটাকে আরও চারিয়ে দিতে হবে। কারণ গরীব দেশগুলিকেতো এখনও তাদের অর্থনীতি বিকাশের জন্য কিছু জায়গা দিতে হবে, একদম পিছিয়ে পড়া মানুষদের একটা মিনিমাম মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্বের জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। এই থেমে যাওয়ার মানে কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দা নয়– ডুবে যাওয়া নয়, বরং পরিকল্পিত এবং ন্যায়সঙ্গত অর্থনৈতিক সংকোচন, যাতে অর্থনীতি অবশেষে একটা স্থির অবস্থায় পৌঁছাবে যা কিনা পৃথিবীর মত সম্পদের সীমার মধ্যে থাকে– নিজেকে নিজের লেজ খেতে হবে না।
মানে ভর্তি মুড়ির টিনকে ঝাঁকালে যেমন তার মধ্যেও জায়গা তৈরি হয়? সবাই একই জায়গায় নড়ে চড়ে ওই জায়গার মধ্যেই ভাগাভাগি করে মানিয়ে নেয়?
এ তো সাংঘাতিক বললে! এবারে তুমিই বল আমি শুনি। মুড়ির টিনের মত আর কোন উদাহরণ মাথায় আসছে তোমার?
এই যেমন ধর যদি স্থানীয় স্তরে কারিগরি দক্ষতা বাড়ানো যায় আর বড় কলকারখানার বদলে আরও ছোট কারখানায় জোর দেওয়া যায় তবে বড় কারখানার উপরে উৎপাদনের চাপ কমবে। উৎপাদনের উপরেও একটা সিলিং করে দেওয়া দরকার এর সঙ্গে হয়ত । হতে পারে, একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির রোজগার কমবে – কিন্তু দেশের সার্বিক রোজগার এতে কমবে না বরং বৈষম্য কমবে। আর স্থানীয় অর্থনীতি আরও জোরদার হবে, কাজ তৈরি হবে। একটা জেলা স্তরে জামাকাপড়, জুতো, স্বাস্থ্য পরিষেবা, ইশকুল, কলেজ, খাদ্য উৎপাদন – এসবের পরিকল্পনা আর সেই মত জমি আর সম্পদের ব্যবস্থপনা করা কি খুব কঠিন কাজ?
বাঃ, তার মানে একটা সার্বজনীন ধারণার কথা উঠে আসছে। সেই ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভলিউশন থেকে কয়েক দশকে টেকনোলজি বা প্রযুক্তির কিন্তু অসাধারণ অগ্রগতি হয়েছে, মানুষও আরও দক্ষ হয়ে উঠেছে তবুও আমাদের কিন্তু এখনও চাহিদার শেষ হল না। কারণ, আমরা আমাদের পার্থিব লিমিটকে অস্বীকার করছি, ভুলে থাকছি – তাই আরও বেশি খরচ এবং আরও বৃদ্ধিতে আবার বিনিয়োগ – এমনি এক চক্রে আটকে গেছি। বৃদ্ধি মানে যাকে তোমরা গ্রোথ বল – ওটা একটা লাগাম ছাড়া ঘোড়ার মত। উৎপাদন দক্ষতার সঙ্গে করছি মানেই সকলের কাছে সমান ভাবে সব পৌঁছে যাচ্ছে তা নয়। ২০১৩ র হিসেবে গড়ে ২৪০০ ক্যালরি খাবার উৎপাদন হয় ভারতে – অথচ কত লোক খেতে পায়না, সেটা তুমি জান। একসময় সাফল্যের সংজ্ঞা হিসাবে যে জীবনযাত্রাকে আমরা মানতাম তাইই এখন আমাদের বৃহত্তম ব্যর্থতা হিসাবে প্রমাণিত হচ্ছে।
কিন্তু সবাই তো চিকেন বার্গার খেতে চাইতেই পারে। তখন তোমার এই সার্বজনীন অর্থনীতি তার জোগান দিতে পারবে তো?
আবার তুমি ঢ্যাঁড়শের অর্থনীতিতে ফেরত যাচ্ছ। আমার বার্গার খেতে ভালো লাগেনা। বার্গারই জীবনের একমাত্র চাহিদা, একমাত্র খাবার সেটা বোঝাল কে? বাজারের সঙ্গে এই চাহিদা বিষয়টার একটা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে - এবং চাহিদার সঙ্গে কনজিউমারিজমের– মানে ভোগ্যপণ্যের প্রতি নেশার। সমাজে আমার অবস্থানও এই কনজিউমারিজমের, অর্থাৎ আমি কী কিনছি, আমার যা ইচ্ছা তাই আমি কিনতে পারছি কি না - এর ভিত্তিতেই তৈরি হয়। এই যে ইচ্ছা – এইটা শুধুমাত্র আমার ব্যাক্তিগত চাহিদার থেকে আসে না, এটা আশে পারিপার্শ্বিক থেকে – যা সরকারি মদতে তৈরি করে বহুজাতিক ব্যবসায়িক সংস্থারা। কারণ তোমাকে লোভ দেখাতে পারলে তবেই তাদের মুনাফা। আমরা এর দাস মাত্র। অনেক কেনো, বেশি বেশি ব্যাবহার কর আর ফেলে দাও – এই হচ্ছে তার নীতি। বাজারের এই ব্যবস্থাটা আর কাজ করছে না – কারণ এতে বৈষম্য বাড়ছে এবং যাকে পছন্দ হচ্ছে না – বাজার তাকে ফেলে দিচ্ছে। এই মানসিকতাটা থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ তো একরকম নেশা। এই যে বিজ্ঞাপনমুখী হয়ে থাকা - তার মানে মানুষের নিজের কল্পনা শক্তির একটা প্রবল অবনতি হয়েছে বলতে হবে – অন্য লোকে ভেবে দিচ্ছে, বলে দিচ্ছে – আমার কী চাহিদা। এরকম বিজ্ঞাপন দেখেছ যা অনেকে একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারে এরকম কোন পন্যের কথা বলছে?
তার মানে তুমি বলছ প্রস্তর যুগে ফেরত যেতে?
একদম না। আমি বলছি নিজের প্রয়োজনটাকে বোঝা – চাহিদার বানিয়ে তোলা ভাঁওতা থেকে আলাদা করে সকলের প্রয়োজনের জায়গাটা ছেঁকে নেওয়া। যা পৃথিবীর মোট সম্পদের বা পরিবেশের উপরে আলাদা করে বোঝা চাপাবে না।
তার মানে গ্রিন টেকনোলজি?
এই রে! এবারে আমি যা বলব শুনে তুমি রেগে যাবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি একটা টেম্পরারি ঠেকা দেওয়ার ব্যবস্থা। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রাথমিক খরচ প্রচুর – যদি তুমি আদতে গাড়ি ব্যাবহার না কমাও তাহলে বিকল্প শক্তিতে সেই খরচ করে লাভ নেই। ব্যবহারের জায়গা, অপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের জায়গাটা একই থাকবে কিন্তু আপনি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে চলে যাবেন সেটা একটা সোনার পাথরবাটির মত – আসল সমস্যাটা এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেই ব্যক্তিগত ব্যবহারের প্রশ্নই আসছে ঘুরে ফিরে। কিন্তু এটা একজন বা দুজনের ব্যবহার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়, তাহলে ঐ জৈবখাবারের নাম করে বেশি দামে মুনাফা তৈরির চেষ্টাই থাকবে। এমনকি, তথাকথিত বুদ্ধিজীবিরাও বাজারে ও ব্যবসায় কৃষকের অংশগ্রহনের কথা না ভেবে, উৎপাদকের সমবায়ের কথা না ভেবে, গা বাঁচিয়ে শহরে জৈব আউটলেট খুলবেন। বরং কনজাম্পশন দিয়ে বা ভোগ্যপণ্য ব্যবহার দিয়ে সামাজিক অবস্থান মাপার যে সংস্কৃতি - সেই প্রাথমিক বেড়াটা ভেঙ্গে ফেলতে পারলে তবেই টেঁকসই প্রযুক্তি ও চিন্তার সুফলগুলো পাওয়া যাবে। এবং তখন এই ব্যাক্তিগত প্র্যাকটিস গুলি লোকে শ্রদ্ধার চোখে দেখবে। সংস্কৃতি বদলায়নি বলে অধিকাংশ মানুষ এই সংকট কেসংকট হিসাবে মানছেন না – একটা ডিনায়াল-এর অবস্থানে আছেন– ‘ও লোকটা কিপটে তাই জামা কাপড় কেনে না’ ‘এত রোজগার করে তবু দ্যাখো বাসে করে অফিস যায়, পাগল! ’‘জৈব খাবার - ও সব ফ্যাশন। এই তো পেস্টিসাইড খেয়েও দিব্য আছি’। রিসাইকেল, রিইউজ – এই মুখস্ত বুলির এক ধাপ আগে গিয়ে রিডিউস করা যায় কিনা, এই চিন্তাটায় ফিরতে হবে - তারপর অন্য কিছু। কারণ রিসাইকেল, রিইউজ ও পণ্যের ব্যবহারকে মাথায় রেখেই – এই পণ্যটার দরকারটাকেই ভ্যানিশ করে দিতে হবে। প্লাস্টিকের বদলে মাটির ভাঁড় – ভালো, কিন্তু মাটির ভাঁড়ও যে রিসাইকেল হল না – সেটা খেয়াল আছে তো? পোড়া মাটি মাটি নয় – তাতে গাছ হবে না। বিদ্যুৎচালিত গাড়ির বিদ্যুৎ এসেছে কয়লা পুড়িয়ে। এগুলি একটা ছদ্ম টেঁকসইয়ের গল্প, পণ্যের ব্যাবহারটিকে ঘিরে – তার প্রয়োজনীয়তাকে ঘিরে নয়। সংস্কৃতিতে বদল এলে তবেই প্রয়োজন অনুযায়ী চাহিদা ও সেই অনুযায়ী উৎপাদন – এটা ভিতর থেকেই আসবে।
তুমি আবার গুলিয়ে দিচ্ছ। যা যা মনে হত দারুণ তুমি এখন তা নস্যাত করে দিচ্ছ। তাহলে এরকম একটা জায়গায় পৌঁছানো মানে ঠিক কী? আর পৌঁছাবই বা কি ভাবে?
ওই যে তুমিই তো বললে – অর্থনীতিকে আরও স্থানীয় করে তোলার একটা উদাহরণ। এর সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত জুড়ে ব্যবসা বাণিজ্য ধীরে ধীরে কমিয়েআমদানী -রপ্তানীর পরিধিটা আরও ছোট করে আনার ব্যাপারটা আসতে পারে। তাতে অনাবশ্যক কার্বনের দায় এড়ান যাবে। এই যে টেকনোলজি, ঝট করে মিটিং করে নেওয়া যাচ্ছে – এটাও তো দেখ কত কার্বন এমিশন কমাল। এটা কি তোমার প্রস্তর যুগে হত? সুতরাং ফিরে যেতে গেলে সবসময় পিছিয়ে যেতে হবে এরকম নয় রে ভাই। চাহিদা কমলে কাজের প্রয়োজনও কমে আসবে – আরও বেশি বেশি করে এমন এমন কাজে নজর দিতে পারব যা দেশের দশের প্রয়োজন মেটায় – যেমন পড়ানো, যৌথ চাষ, সংস্কৃতি চর্চা – এই সব। যে যেটা পারে, যে যেটা করতে চায়।
ওই যে মানসিকতা বদলের কথা হচ্ছিল, সেটাও তো অনেক সময় সংস্কৃতি থেকে জন্ম নেয়।
সে তো বটেই – সে তো শুধু স্পন্সর নেওয়া নাটক গানের উৎসব করলেই হবে না। যেমন ধর, পুরনো কাপড় থেকে নতুন কাপড় বানানোর কী সব চমৎকার ডিজাইন আজকাল করেন লোকে – সে শুধু আর্ট গ্যালারিতে শোভা পায়। আমরা এরকম ব্যবসাও তো শুরু করতে পারি। ব্যবসা হল, প্রয়োজন মিটল – অথচ মনের খোরাক –শিল্প, তাও হল। বুঝতে পারছ? এতো তোমার লাখ টাকার গ্রীন টুরিজমের কথা বলছিনা কিন্ত। একটা উপায় ঘাড়ে ধরে করানো, তার একটা অন্য পিঠ ইকলজিক্যাল কোলাপ্স – হুড়মুড় করে সব ভেঙ্গে পড়ল। যার একটা ছোট্ট মহড়া আমরা দেখছি এখন – নিজেদের থালা-বাটি-গ্লাস বগলে নিয়ে ঘুরে বেড়ালে একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া থালা-বাটি-গ্লাসের চাহিদা এমনিই কমে আসবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সেমিনার প্লেনে না চেপেও করা যায়। পুঁজিবাদীবাজার-অন্ধ সমাজচাপে পড়লে নিজে নিজেই এই অস্বীকারের-এর অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসবে। যাকে তোমার বল স্টেট অফ ডিনায়াল বল। তবে ভেঙ্গে পড়ার আগেই চোখের পট্টি খুলে যাওয়াই কাম্য। সংস্কৃতি বদলের একটা ধীর প্রচেষ্টা হতে পারে মানুষের সামাজিক ভুমিকাকে আরও প্রাধান্য দেওয়ায় সুযোগ তৈরি করা – সে যে কোন কাজে দলকে প্রাধান্য দেওয়াই হোক বা চিরাচরিত সনাতনী দলগত উৎসব, অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেই হোক। যেমন – এমন বাজার ব্যাবস্থা গড়া যাতে উৎপাদক-বিক্রেতা-ক্রেতার পারস্পরিক যোগাযোগের জায়গা তৈরি হয়। বিকেন্দ্রীকরণ সত্যি হলে এমন সুযোগ অবশ্য তৈরি হতে বাধ্য। সামাজিক অংশগ্রহন যত বাড়বে – সম্ভবত শ্রদ্ধা, ভালবাসা, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, বিশ্বাস, স্বশাসন – পণ্যের বাইরে এইসব চাহিদাগুলির প্রয়োজনীয়তা আমাদের কাছে আরওপরিষ্কার হবে। সামাজিক অংশগ্রহন তখন সামাজিক অবস্থানের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়াবে–ভোগপণ্য ব্যাবহার নয়। সেটাই সংস্কৃতিগত পরিবর্তন – এবংপ্রয়োজন-চাহিদা-পণ্য এই সমীকরণটাই বদলে যাবে তখন। সেই ঘোড়াটাকে লাগাম পড়ানোর সময় এসে গেছে মনে হচ্ছে।
এ তো লম্বা গল্প!
গল্প লম্বা হওয়ার ভয়ে না পড়লে তো আর গল্পটা পড়াই হবে না তোমার। শিল্প বিপ্লবের এত বছর পর আমরা এসব ভাবছি – এতদিনের ছাপ তুমি তিনদিনে মুছে ফেলবে? লোকে কিন্তু এদেশে বিদেশে নানা রকম লাগাম তৈরির কাজ শুরু করেছে। সে সব কাজে লেগে পড়। আরও লোকজন জড়ো করা যাক – হৈ হৈ হোক। যাঁদের মাস মাইনের নিশ্চিন্তি আছে, মানি ব্যাগে টাকা আছে – তাদের ছাড়াও আরও লোকজন এই চিন্তায় আসুক। ও হ্যাঁ, সময় পেলে একটু গুগল করে ‘ডিগ্রোথ’ নিয়ে সার্চ করে দেখ। আর খুঁজে পেতে গান্ধীর স্বরাজ চিন্তা, রবীন্দ্রনাথের সমবায় চিন্তা, পল্লীপ্রকৃতি, এমন কি সদ্য নোবেল পাওয়া অভিজিত ব্যানার্জীর লেখাপত্রও পড়ে ফেলা ভালো। সব যে একদম ঠিকঠাক তোমার পছন্দ হবেতা নয় – তবে ওখান থেকেই ঝাড়াই বাছাই করে নিজের চিন্তাগুলোর গোঁড়ায় জল দিতে হবে আর কি।আগে তো ঘোড়াটাকে থামাও, নিয়ন্ত্রণে আনো – তারপর তো তাকে চালাবে।
--------------------------------------------------------------------------------------------------
লেখক পরিচিতি
‘‘যাপন” ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যার প্রচ্ছদ ভাবনার লেখক; অংশুমান দাশ শান্তিনিকেতনে বড় হয়েছেন। বিকল্প উন্নয়ন নিয়ে হাতেকলমে কাজ করেন – সেই সঙ্গে লেখালেখি, অ্যাগ্রোইকোলজি পড়ানো। দেশে-বিদেশে-হাটে-কৃষকের মাঠে-বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে থেকে চাষ-বাস-ভালো থাকা-ভালো রাখা শিখছেন অংশুমান।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন