শনিবার, ১০ জুন, ২০২৩

২য় বর্ষ ২য় সংখ্যা - প্রচ্ছদ কাহিনী - তোতাকাহিনী ও তারপর - মালিনী মুখার্জী


তোতাকাহিনী তারপর

মালিনী মুখার্জী

 

প্রতিবেশি রাজ্যে কাজে গেছি। সরকারি অফিসার বললেন, “ চলুন আপনাকে SMART ক্লাস দেখিয়ে আনি।সাধারনভাবে SMART ক্লাসে শিশুদের শেখাবার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, অর্থাৎ কম্পুটারের সাহায্যে পড়ানো হয় এবং অন্যান্য যন্ত্র, যেমন প্রোজেক্টর ইত্যাদি থাকে। কোভিডের আগেও অনেক স্কুলে সরকারের তরফ থেকে বা নানান বেসরকারি উদ্যোগে প্রযুক্তি ব্যাবহার করে পড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমি আগে বেশ কিছু SMART স্কুল দেখেছি - সরকারি এবং বেসরকারি দুইই। ফলে কী দেখতে পারি তার একটা আন্দাজ  ছিল।

 

স্কুল বেশ বড়, হেড মাস্টার হাস্যমুখ। ছেলে মেয়েরা আলাদা বসে। কেন? “গার্জিয়ানরা পছন্দ করেন না,” - হেড স্যার বুঝিয়ে দিলেন।লাইব্রেরিতে অনেক বই, সরকারের তরফ থেকে দেওয়া SMART স্কুলকে তার সবটাই তালাবন্ধ আলমারিতে, পাছে বাচ্চারা ছিঁড়ে ফেলে, নষ্ট করে। দেওয়ালে পকেট বোর্ড ঝোলান, যেখানে গল্পের বই থাকার কথা- বাচ্চারা নিয়ে পড়বে।সেখানে খান তিনেক কমদামী বই ঝুলছে। এইসব দেখিয়ে টেখিয়ে আমায় নিয়ে যাওয়া হল ঝাঁ চকচকে SMART ক্লাসে। কম্পিউটার লাগানো, সেখানে মানব শরীরের ছবিদেখা যাচ্ছে মাটিতে মানব শরীর আঁকাভাবলাম বাঃ!

 

শিক্ষক পড়াচ্ছেন- “তারপর শিক্ষক মাটিতে একটা মানবশরীর আঁকবে।তারপর ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে জীজ্ঞাসা– “কী করবে ?”

সব ছাত্র ছাত্রীরা এধার ওধার তাকাতে তাকাতে নখ খুঁটতেখুঁটতে সমস্বরে বলছে- “মানবশরীর আঁকবে এ।

শিক্ষক বলছেন- “তারপর শিক্ষক বাচ্চাদের বলবে, এবার তোমরা সংবহনতন্ত্র এঁকে দেখাও।আবার প্রশ্ন, “কী বলবে ?”

ছাত্র ছাত্রীরা আবার ঘ্যানঘ্যানে গলায়- “এবার তোমরা সংবহন তন্ত্র এঁকে দেখাও

শিক্ষক বলছে- “তারপর শিক্ষক বাচ্চাদের বলবে, এবার তোমরা এক এক জন, এক একটি অঙ্গের ওপর দাঁড়াবে আর সেগুলির কী কাজ, তা আলোচনা করবে। কী বলবে ?”

বাক্য লম্বা। ছাত্র ছাত্রীরা মন দেয়নি। যে যার মত এটা ওটা বলল।

এইভাবে চলতে থাকল।

 

আমি বুঝলাম যে এইপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক তারটিচার্স ম্যানুয়ালবা শিক্ষক নির্দেশিকা থেকে শিক্ষকদের জন্য যে নির্দেশ আছে, সেটাই না বুঝে পাখি পড়িয়ে চলেছেন। তাঁর মজ্জায় ঢুকে থাকা অভ্যাস থেকে তিনি বেরোতে অপারগ- তাই যতই চিত্তাকর্ষক উদ্ভাবনীয় পড়ানোর কথা নির্দেশিকাতে লেখা থাক, তিনি সেটিকেও তার ছকে বাঁধা মুখস্ত করানোর পদ্ধতিতে নিয়ে এসে ফেলেছেন। SMART ক্লাসের উপাদান আছে, কিন্তু তা কেবলই বাহ্যিক।যারা প্রশিক্ষণ  দিয়েছেন, তারা আশা করেছিলেন যে এই ক্লাসে শিশুরা নিজে হাতেকলমে  করে শিখবে, আলোচনা করবে, পড়াশোনায় আনন্দ পাবেতার জন্য তারা শিক্ষক নির্দেশিকা দিয়েছেন, প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, শিশুদের জন্য লেখার ওয়ার্ক বুক দিয়েছেন, অ্যানিমেটেড ফিল্ম দিয়েছেন, স্কুল বিশেষ ধরণের জায়গা দিয়েছে, সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়েছেন...কিন্তু শিক্ষার মান সেই তিমিরেই। গর্বিত হেড স্যার আর সেই সরকারী কর্তাব্যক্তিকে আমি মুখ ফুটে বলতে পারলাম না সেকথা। তাঁরা তো এই পদ্ধতি দেখেছেন নিশ্চয়ই , কিন্তু তাঁরাও বুঝতে পারছেন না যে এভাবে হবে না।

 

আমাদের দেশে গত  কয়েক দশকে, শিক্ষা নিয়ে নানান নতুন চিন্তা ভাবনা, পরীক্ষা  নিরিক্ষা, গবেষণার হয়েছে- সেটা আনন্দের কথা। তার সাথে সেই সব ভাবনাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসার চেষ্টাও চলেছে। কিন্তু কতটা কী করা গেছে, সেটাই ভাবনার বিষয়। এই লেখায় আমি সেইসব নতুন ভাবনা, তার প্রয়োগ এবং কোথায় কতটুকু করা গেছে বা যায়নি, কেন যায়নি, কী করা যেতে পারত সে কথা আলোচনার চেষ্টা করব।গত দু দশকে ঘুরে ঘুরে ভারত বর্ষের নানা জায়গায়, গ্রাম থেকে শুরু করে বড় শহর, নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এই লেখা। যেহেতু এখানে বিস্তৃত আলোচনা করা যাবেনা,আমি কেবল মূল ধারার স্কুলের কথাইবলব এখানে।

 

শেখানো নয়, শেখা

 

গুরু শিক্ষার ধারক বাহক আর গুরুই শিক্ষাপ্রদানকরবেন। গুরু ঠিক করবেন কী শেখানো হবে, কিভাবে শেখানো হবে, কতটা শেখানো হবে, কোন বয়সে কী শেখানো হবে।এই ছিল আদি ধারণা। তারপর  এল স্কিনার এরবিহেভিওরিজম’, ভায়গোস্কির  কন্সট্রাক্টিভিস্ম’ ( সে সব তত্ত্ব এখানে দেওয়ার জায়গা নেই, পাঠক কে অনুরোধ একটু গুগল করে নেবেন)আর শিক্ষকের কাজপ্রদানকরা থেকেআদান প্রদান’- চলে এল। তাঁকে আরশেখাতেহচ্ছে না- বরং শেখানোর পরিমণ্ডল তৈরি করতে হচ্ছে। এইখানেই বাধল গোল। এতদিন আমরা জানতাম ছাত্ররা হচ্ছে খালি বোর্ড, যাতে শিক্ষক খচ খচ করে সব লিখে লিখে ভরে দেবেন। কিন্তু তা যদি নাহয় তাহলে কে বলে দেবে ছাত্ররা আদৌ কিছু শিখল কিনা?আর তাহলে তো শিক্ষকের কোন কাজই রইল না।

শিক্ষক সম্প্রদায় এবং বাবা মা ঘাবড়ে গেলেন।

 

কিন্তু সত্যিই কি শিক্ষকের কাজ থাকল না? আসলে এই কিন্ত কাজ সরল নয়। শিক্ষক পাঠ পরিকল্পনা করবেন, পড়াবেন, কতটা কিভাবে শেখা হবে তা নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন, ছাত্ররা নিজেরা  কিভাবে পাঠ্য বিষয় নিয়ে আলোচনা, পরীক্ষা, তর্কবিতর্ক, গবেষণা করবে, এবং কোনভাবে তাদের শেখাগুলি ভাগ করে নেবে - এই পুরো পরিকল্পনা করবেন, শিখন সামগ্রী যোগান দেবেন, নির্দেশ দেবেন (কিন্তু কখনই উত্তর বলে দেবেন না), মূল্যায়ন করবেন, আবার দরকারমত শেখার রাস্তা বদলাবেন। ছাত্ররা যাতে নতুন নতুনজ্ঞান উদ্ভাবন করতে পারে, তার দিকেও নজর রাখবেন। এই যাঃ!! তো কাজ বেড়ে গেল। তার থেকে বই দেখে মুখস্ত করিয়ে দেওয়া সহজ নয়? তাছাড়া এত সময় কোথায়? সিলেবাসের সমস্ত পাঠপড়াতেহলে এতকিছু কীকরে হবে?

 

এই প্রশ্নের সম্মুখীন আমায় বার বার হতে হয়েছে। যদি বলি যে , আচ্ছা আপনাদের কি সিলেবাস (অনেকের কাছে তার মানে পাঠ্যবইয়ের চ্যাপ্টার) শেষ করতে বলা হয়েছে, না শিশুদের দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে, কারণ ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেম ওয়ার্ক তো তাই বলে। শিক্ষকরা সবসময় বলেন, তা যে যাই বলুক না কেন। ছাত্ররা শিখুক না শিখুক, বই যেন পুরো শেষ হয়। স্কুল, এমনকি অনেক সময় স্কুল বোর্ডেরও তাই নির্দেশ ।বাঁধাধরা সময়ে উদ্ভাবনীয় কিছু করা সম্ভব নয়। অতএব দক্ষতা নিয়ে ভাবলে চলবে না। তাছাড়া , আমাদের দেশের বেশিরভাগ ক্লাস রুমে, শিক্ষক ক্লাসের সামনে উঁচু প্লাটফর্মে বসে থাকেন। ছাত্ররা সামনের দিকে মুখ করে লাইন দিয়ে বসে। ক্লাসে শিক্ষকের ঘোরা ফেরার জায়গা নেই। শিশুদের মুখোমুখি বসার জায়গা নেই। অনেক স্কুলে ডেস্ক আর বেঞ্চ এক সাথে জোড়া (কার মাথায় কেন এই পরিকল্পনা এসেছিল জানিনা) এইরকম একমুখী (পড়ুন শিক্ষকমুখী) বসার পরিকল্পনা হলে আলোচনা, বিতর্ক, হাতে কলমে একসাথে দলে কাজ কিভাবে হবে? আমাদের ক্লাস রুমের জায়গা, বসবার ব্যবস্থা  কোনটাই  এসবের জন্য উপযোগী নয়। আর দুঃখের বিষয় রবীন্দ্রনাথের দেশে আমরা ক্লাস রুমের বাইরে পড়াশোনাকে এখনওমর্যাদাদিয়ে উঠতে পারিনি।

 

মুখস্ত নয় প্রয়োগ

 

পাঠকদের মনে থাকতে পারে, আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন মা বাবারা বলতেন , উঠে বসে সোজা হয়ে জোরে জোরে পড়। অর্থাৎ,ভেব না, মুখস্ত করে নাও- প্রশ্নোত্তর, রাজা নেতা গাছপালা নদীনালা দেশ ইত্যাদির নাম, টিকা, বছর, নামতা সব।মুখস্ত করা জরুরী, কিন্তু নতুন শিক্ষা দর্শন বলছে , তার সাথে দরকার বোঝা, অনুধাবন করতে পারা, প্রয়োগ করতে পারা, বিশ্লেষণ করতে পারা আর নতুন জ্ঞান তৈরি করতে পারা। এর জন্য পড়াশোনার কাজে পড়ুয়াদের মানসিক এবং শারীরিক ভাবে সক্রিয় যোগদান থাকতে হবেকেবল নিষ্ক্রিয় গ্রাহক হয়ে থাকলে হবে না। দরকার হবে পর্যাপ্ত জায়গা, যথেষ্ট সংখ্যক শিক্ষক, শিখন সামগ্রী , নতুন ধরনের শিক্ষা নির্দেশ ইত্যাদি।

এখানেই , যাকে বলে, কবি কেঁদেছেন। ভারতবর্ষ জিডিপির মাত্র সাড়ে তিন শতাংশর মত শিক্ষাখাতে ব্যয় করে। এই দিয়ে খুব কিছু করা যায় কী? শুধু অর্থই সমস্যা নয়। যেটুকু অর্থ আছে তাকে কিভাবে ব্যয় করতে হবে তা অনেক সময় স্কুলের জানা থাকে না।  শিখন সামগ্রীর টাকা লাগিয়ে দেওয়া হয় দেওয়ালে টাঙানোর জন্য মনীষীদের ছবি কিনতে। যেসব  বেসরকারি স্কুলে টাকাপয়সার সমস্যা নেই, তারাও কি অত ভাবনা চিন্তা করেন?

 

যথেষ্ট শিক্ষককথাটাও সোনার পাথরবাটি। সরকারী স্কুলে সবসময় কম শিক্ষক নিযুক্ত থাকে, আর যেকজন থাকেন তাঁদের পড়ানো ছাড়াও অনেক কাজে নিযুক্ত থাকতে হয়। যেমন সরকারী সার্ভে, ভোটের ডিউটি,  মিড ডে মিলের হিসেব নিকেশ ইত্যাদি। কে করবে ক্লাস পরিচালনা নিয়ে নতুন ভাবনা ? এছাড়া গতানুগতিকতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট উৎসাহ, মানসিকতা চর্চার অভাবও আছে। তা সে যে কোন ধরণের স্কুলই হোক না কেন।

 

মুখস্ত থেকে বেরিয়ে আসার আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা হল ভুল করার ভয় বা সফল না হওয়ার দুশ্চিন্তা শেখার জন্য ভুল করা জরুরীযাতে ঔৎসুক্য বাড়ে, সমাধান খোঁজের চেষ্টা বাড়ে আর অসাফল্য কে গ্রহণ করতে পারাও এক ধরণের শিক্ষা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাঅসাফল্যকে স্থান দেয় নাতার থেকে মুখস্ত করে সফল হওয়াঅনেক সহজ এবং গ্রহণ যোগ্য।স্বল্প জায়গা আর স্বল্প সময়ের কথা আগেই বলেছি , তাই আর এখানে উত্থাপণ করলাম না।  নষ্ট করার সময়না থাকলে শিক্ষা সম্পূর্ণ হবে কিভাবে?

 

নেই ভাবনা থেকে চিন্তা ভাবনা

 

এখনকার শিখন সংস্কৃতিতে পড়ুয়াদের চিন্তা করার ক্ষমতাকে একটা বড় দক্ষতা ধরা হয়।  যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা, অনুমান করতে পারা , সমস্যার সমাধান খুঁজতে পারা , সৃজনশীল চিন্তাভাবনা এবং সম্প্রতিডিজাইন থিঙ্কিংএর ওপর খুব জোর দেওয়া হচ্ছে। তাহলে দেখা যাক এধরনের দক্ষতা শেখানোর জন্য কী প্রয়োজন।

-              এমন পাঠ্যক্রম যেখানে সৃজনশীল আর বৌদ্ধিক কাজের নানা সুযোগ আছে

-              এমন মানসিকতা যা কেবল একমাত্রসঠিকউত্তরের পিছনে দৌড়বে না, বরং নানারকম সমাধানের কথা পর্যালোচনা করবে

-              এমন শিক্ষক যারা জানেন কিভাবে প্রতিদিনের আদান প্রদানেচিন্তার কৌশল, পন্থা আর পদ্ধতি নিয়ে আসবেন

-              ভাবনা চিন্তা প্র্যাকটিস করার জন্যই আলাদা ক্লাস

-              চিন্তা করার যথেষ্ট সময় দেওয়া - উত্তর দেওয়া নয়, উত্তর খোঁজা

-              সারা বছরে একবার বা দুবার পরীক্ষা নয়, ছোট ছোট মূল্যায়ন করে পড়ুয়াদের বৌদ্ধিক বিকাশের অবস্থান বোঝা।


কিন্তু ধরা বাঁধা ক্লাসে এসব সম্ভব কী?


অনেক সময় শিক্ষকরা পড়ুয়াদের বলেন, “ ভেবে উত্তর  দাও।ধরে নেওয়া হয় যে তারা নিজের বুদ্ধিমত্তার সঠিক প্রয়োগ করে সঠিক উত্তর দেবে। কিন্তু বুদ্ধিকে কিভাবে প্রয়োগ করতে হয় তা কখনোই শেখানো হয়না। সেটা যে শেখানো যায়, তাই বিশ্বাস করেন না। তাছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখি, শিক্ষক প্রশ্ন করে অপেক্ষা করেন কখন তিনি নিজেই সঠিক উত্তর দেবেন।

 

আজকাল পাঠ্যপুস্তকেকী ওয়ার্ডসবা মূল জরুরি শব্দগুলি মোটা অক্ষরে দেওয়া থাকে। উত্তরে কী ওয়ার্ডস না থাকলে নম্বর কাটা যাবে। আমি এমন খাতা দেখেছি , যেখানে ছাত্র নতুন ভাবে উত্তর বিশ্লেষণ করেছে, কিন্তুকী ওয়ার্ডসনা থাকায় নম্বর কাটা গেছে। তার মানে নতুন চিন্তার কোনো জায়গা নেই। পাঠ্যপুস্তক যেটুকু দাগিয়ে দিয়েছে সেটাইএকমাত্রউত্তর। রোয়াল্ড ডাল আর ডঃ সিউস নিশ্চয়ই নতুন নতুন শব্দ তৈরি করার অপরাধে গোল্লা পেতেন আমাদের মূল্যায়ন ব্যবস্থায়।

 

মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হল দেশ জুড়ে –Continuous and Comprehensive Evaluation - CCE অনেক প্রশিক্ষক (আমিও তার মধ্যে) ‘এন সি আর টি হয়ে স্কুলে স্কুলে গিয়ে প্রশিক্ষন দিলেন -কিভাবে নানা ভাবে বিভিন্ন পদ্ধতিতে ছোট ছোট মূল্যায়ন করা যায়, যাতে চলতে চলতেই বোঝা যায় পড়ুয়াদের কোথায় খামতি আর সাথে সাথে সমাধান করা যায় , বছর শেষের মূল্যায়নের অপেক্ষায় না থেকে। জোর দেওয়া হল কিভাবে পড়ুয়াদের চিন্তা শক্তি বাড়ানো যায় সেসব পদ্ধতি অবলম্বন করারতার জন্য মূল্যায়ণ কেবল মাত্র কাগজ কলমে নয়, আরো নানা ভাবে করা যেতে পারে। কিছুদিন পর দেখা গেল পড়ুয়াদের আর শিক্ষকদের চাপ অনেকগুন বেড়ে গেল। কারন স্কুল, বোর্ড সবাই আশা করছেন যে সব পরীক্ষাই লিখিত পরীক্ষা হবে। অতএব দিস্তা দিস্তা খাতা দেখার চাপ প্রতি মাসে। মৌখিক, প্রকল্প ভিত্তিক(প্রজেক্ট), anecdotal records, বিতর্ক, ক্লাসে অংশগ্রহণ, সৃজনশীলতার প্রকাশ এই সব দেখে মূল্যায়নের কোন জায়গাই নেই। যে মূল্যায়ন ধরাবাঁধা গতে চলবে, সেই মূল্যায়নের প্রস্তুতিও ধরাবাঁধাই হবে। সেখান নতুন চিন্তার কোন স্থান নেই।

 

তাহলে কী করা যেতে পারে

 

কী পড়াব- কেবলমাত্র পাঠক্রমের অধ্যায়গুলি শেষ করার ওপর জোর না দিয়ে, ধারণা (idea)আর দক্ষতার (skill)ওপর জোর দেওয়া শিক্ষক আর পড়ুয়ারা নিজেরাই বাছুক সেই ধারণা আর দক্ষতা আয়ত্ত করতে কী পড়ানো হবে। শুধু বই থেকে নয়, গান, চলচিত্র, ছবি, জিনিষপত্র, জায়গা, মানুষ সব কিছুই পাঠের উপকরণ হিসেবে  নির্বাচিত হোক। বাঁধা ধরা সময় না রেখে,যতক্ষণ সময় লাগে তা দেওয়া যেতে পারে। অল্প সময়ে অনেক অধ্যায় আয়ত্ত করতে গিয়ে কিছুই না শেখার গল্প আমাদের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে। এভাবে শিক্ষক নিজের মত করে পাঠ পরিকল্পনা করতে পারবেন, পড়ুয়াদের স্তর, সময়, সাংস্কৃতিক অন্যান্য প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে। কিন্তু তার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমর্থন আর সাহায্য চাই। প্রতি লেভেলএ বিষয় অনুযায়ী - টি ধারনা আর - টি বিশেষ দক্ষতা আয়ত্ত করতে পারলেই হল। পরের লেভেল এগুলির পুনঃচর্চা আর নতুন ধারনা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়শান্তি’ – Peace এরকম একটি ধারণা। আমার ভাষা, ইতিহাস ক্লাসে এই ধারণার কথা মাথায় রেখে পাঠ বাছব। ক্লাসে নানা কাজের মাধ্যমে পরস্পরের চিন্তা ধারা বোঝা, নিরপেক্ষতার ধারণা তৈরি করা, একসঙ্গে দলগত কাজ করা, পরস্পরকে সহায়তা করাএইসব দক্ষতাগুলি গড়ে তুলব। ১০ বছরে ৪০ টি ধারনা আর সেই সংক্রান্ত দক্ষতা কিছু কম নয়।

 

কিভাবে মূল্যায়ণ হবেআর সেজন্য  অধ্যায়ের ওপর মূল্যায়ন না হয়েধারণা আর দক্ষতারনিরন্তর মূল্যায়ণ হবে, যা কেবলএকটি সঠিক উত্তরে অপেক্ষায় থাকবে না। কাজের ধারার মূল্যায়ন হবে, এবং উত্তর ভুল হলেও কাজে যদি উদ্ভাবনী চিন্তার প্রতিফলন থাকে, সেখানে নাম্বার দেওয়া হবে। প্রশ্নও সেইজন্য এমন হবে যেখানে ভিন্ন ভিন্ন উত্তরের সম্ভাবনা থাকবে। কেবল জ্ঞান ভিত্তিক প্রশ্ন নয়বোধ মূলক, প্রয়োগ মূলক, বিশ্লেষণ মূলক, সৃজন মূলক প্রশ্নও থাকবে। যেমন ধরা যাক , - টে দেশাত্মবোধক কবিতা আর গান পড়ে/ শুনে, বিশ্লেষন করে , নিজে একটি গান বাঁধ। আজকাল বিভিন্ন বোর্ডে এই রকম প্রশ্ন রাখার কথা বলা হলেও সব সময়ই কেবল মুখস্ত করা উত্তরের জন্য প্রশ্ন নির্বাচন করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উচিত শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে সময়ে সময়ে প্রশ্নপত্রের মান যথাযথ রাখা।

 

স্কুলে বসার ব্যবস্থাএধরনের শিখন ব্যবস্থার জন্য ক্লাসের জায়গা এবং আসবাবপত্রের ব্যবস্থাপনাশিশু কেন্দ্রিক হতে হবে, শিক্ষক কেন্দ্রিক নয়। শিশুরা যাতে পরস্পরের সাথে কথা বলতে পারে, আলোচনা করতে পারে, কাজ করতে পারে। তার জন্য ক্লাসের বাইরে জায়গা থাকলে সেখানেও ক্লাস হতে পারে সময়ে সময়ে। পরিবেশ বিজ্ঞানের মত বিষয় তো সবকটাই বাইরে হওয়া উচিত। ডেস্ক টেবিল দিয়ে ভরে থাকা ক্লাস নয়, খালি জায়গা যেন থাকে শিক্ষক আর পড়ুয়াদের চলাফেরার জন্য। এখানে বেশি ব্যয় না , স্বল্প ব্যয়ের কথা বলছি। তাই সম্ভব না হওয়ার কোন কারণ নেই। বিশ্বভারতীর বিদ্যালয়ে এখনও চালাঘর গাছের তলাতেই ক্লাস চলে।

 

কিভাবে পড়ানো হবে - নিরন্তর খোঁজের মধ্যে দিয়ে শেখার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। তারজন্য প্রয়োজনীয় শিখন সামগ্রীর জোগান থাকতে হবে।শিখন সামগ্রী মানেই তা বাজারে দাম দিয়ে কেনা চার্ট, ম্যাপ, খেলনা, ইত্যাদি নয়। সেগুলো তৈরি করার জিনিষপত্র যেমন কাগজ, আঠা, রঙ, পাতা, ফুল, মাটি, পাথর, বীজ ইত্যাদি বেশি জরুরী। ঘরে নিত্য ব্যবহৃত জিনিস দিয়ে বিজ্ঞান থেকে ইতিহাস সব শেখানো যেতে পারে।বলে দেওয়াথেকে বিরত থাকতে হবে। নিজে নিজে শেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। পড়ুয়াদের ভুল করার সু্যোগ দিতে হবে। ভুলের মধ্যেও শেখার সু্যোগ থাকে। শেখার জন্য ধীরে ধীরে খোলশ ছাড়াতে ছাড়াতে এগোতে হবেযাতে পড়ুয়ারা বুঝতে পারেপাঠের মূল উদ্দেশ্য কী, ধাপে ধাপে  কিভাবে কাজ করতে হবে, কোন বিষয়গুলি মূল্যায়ন সাপেক্ষ ইত্যাদি।একটি ক্লাসে নানা ধরনের শিশু থাকে। একেকজন একেকভাবে শেখে। কেউ দেখে , কেউ শুনে , কেউ হাতে কলমে কাজ করে। তাদের সবার কথা মাথায় রেখে পাঠ পরিকল্পনা করতে হবে। আলাদা আলাদা ভাবে শেখা এবং আলাদা ভাবে নিজের শেখাকে উপস্থাপন করার (এঁকে, লিখে , গেয়ে, পাওয়ার পয়েন্টে, হাতে কলমে করে দেখিয়ে, মডেল করে, বাগান করে , নাটক করে ইত্যাদি) সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন এর জন্য যথেষ্ট সময় দরকার।  তাড়াহুড়ো করলে কিছু শিশু শিখবে, বাকিরা শিখবে না।

 

চিন্তার বিকাশআলাদা করেচিন্তা শক্তি বিকাশের ক্লাসভাবা হয়ত ধৃষ্টতা , কিন্তু সমস্ত বিষয়ে যৌক্তিক চিন্তা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীল চিন্তা এসব ভাবনার সূ্যোগ সুপরিকল্পিত ভাবে নিয়ে আসতে হবে। সেই ভাবে মূল্যায়নও করতে হবে। উপরে যেসব ধরনের মূল্যায়নের কথা বলা আছে , সেগুলোর সবকটাতেই চিন্তার প্রয়োগ জরুরী।

 

উপরের সব কথাই আমাদের ন্যশনাল কারিকুলাম ফ্রেম ওয়ার্ক- বলা আছে নানাভাবে, আর প্রশিক্ষণেও বলা হয়ে থাকে। মুস্কিল হল এগুলিকে সবাইতাত্ত্বিকধরে নেন এবং স্কুলে এভাবে করা যাবে বলে বিশ্বাস করেন না। তাই প্রশিক্ষকরাও প্রশিক্ষনের সময় প্রশিক্ষনের জায়গাকে কার্যকর ভাবে সাজানো, শিক্ষকদের নিজেদের ভেবে কাজ করতে দেওয়াএসব ভাবেন না (বি এড ক্লাসগুলির কথা ভেবে দেখুন) আমি অন্ততঃ একটি বাইরের দেশের ছাত্রছাত্রীদের পড়াই যেখানে এই সব কথাগুলি মাথায় রেখে পড়ানো হয়।তাদের ক্লাস প্রতি ছাত্র সংখ্যা কম’ – এই বস্তাপচা যুক্তি যদি দিই, তাহলে আসুন এই দাবী তুলি যে আমাদের ছাত্র সংখ্যা মাথায় রেখে সরকার যেন শিক্ষাখাতে আরো টাকা বরাদ্দ করে, যাতে বেশি শিক্ষক নি্যুক্ত করা যায়। আর তার পাশাপাশি, যে কাজগুলো টাকার জন্য আটকে নেই, সেটুকু সুনিশ্চিত করার জন্য তো কিছু করি!

 

--

মালিনী মুখার্জী দীর্ঘদিনের শিক্ষক শিক্ষক প্রশিক্ষক। কলকাতায় বস্তির স্কুল থেকে বিদেশে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুবাদে খুব কাছ থেকে শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্যা সুযোগ খুঁটিয়ে দেখার অবকাশ পেয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

উত্তরবঙ্গের হাতি আর মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান / স্বাতী রায় / ৩য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা

  উত্তরবঙ্গের হাতি আর   মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান স্বাতী রায় দৃশ্যটা প্রথম দেখেছিলাম উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক দূরে, উত্তরাখণ্ডের রাজাজী ...