শনিবার, ১০ জুন, ২০২৩

২য় বর্ষ ১ম সংখ্যা - প্রচ্ছদ কাহিনী - কেমন হবে বাজার - ঋতব্রত ঘোষ


কেমন হবে বাজার

ঋতব্রত ঘোষ

১৭৫৭ সালের আগে ভারতের আভ্যন্তরীণ জিডিপি ছিল ২৫%। অবাক হবেন না। ভারতবর্ষ বলে এখন যা আমরা দেখি, তা অবশ্য তখন ছিল না। অনেকগুলি ছোট ছোট অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ এলাকার একটা সমষ্টি ছিল এই দেশ। খাদ্য, বস্ত্র ও ছোটখাটো নানা প্রয়োজনীয় শিল্পের মাধ্যমে এক একটা কৃষি-বাস্তুতান্ত্রিক অঞ্চল পরিচালিত হত তখন। অভাব বলে কিছু ছিলনা। এরপর ব্রিটিশ রাজ। লুটেররাজ। ঔপনিবেশিক শাসন এইসব ছোটখাটো স্বনির্ভর এলাকাগুলিকে তাদের শিল্পকেন্দ্রিক অর্থনীতির কাঁচামালের রসদ ও বাজার এই দুই ভাবেই ব্যবহার করতে শুরু করল। একে একে হারিয়ে যেতে থাকল বহু বহু স্থানীয় শিল্প। কৃষিতে আক্রমণ হয়েছে আরও পরে। তবে তা কৃষির মূলগত চরিত্র বদলে খুব বেশি ভূমিকা তখনও নিতে পারেনি। জমিদারী লুট আগের তুলনায় বহু গুণ বেড়ে গিয়েছিল। বৃটিশ শাসনের শেষের দিকে খাদ্যশষ্যেরও ব্যাপক লুট হয়। যা সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির যুদ্ধ পরিচালনার কাজে লাগে। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমাদের এই বাংলাও সাক্ষী হয়ে থাকে মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষের। গ্রাম ভাঙতে শুরু করল। শিল্প পুঁজির জয়জয়কার সারা বিশ্বজুড়ে। গফুর আমিনার হাত ধরে তার প্রিয় পোষা বলদ মহেশের লাশ ফেলে রেখে চোখের জল মুছতে মুছতে শহরে সস্তা শ্রমিক হতে পাড়ি দিল। সে ধারা আজও অব্যাহত। গ্রামগুলি একে একে শহরের শিল্পপুঁজির নিয়ন্ত্রণে আসতে থাকল। ভেঙে পড়তে থাকল আমাদের বাস্তুতান্ত্রিক সুস্থিতি। তবে খুব ধীরে। ভাতৃঘাতী দাঙ্গার আর বহু স্বপ্নের অকাল মৃত্যুর শেষে আমরা পেলাম এক দেশের তিনটে টুকরো। আমরা কাগজে কলমে রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলাম। লুটেরারা থেকে গেল। জল-জঙ্গল-জমির লুট তরান্বিত হল। চামড়ার রঙ বদলে সাদা থেকে এবার কালো। জাতীয় শিল্প পুঁজি,  বৃটিশের দালালি করতে করতে যাদের জন্ম, তাদের হাতে এবার দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা এলো। নতুন কৌশলের বলে বলীয়ান ভারতের পুঁজিপতিগোষ্ঠী পূর্ণউদ্যমে বৃটিশের ফেলে রাখা কাজের দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিল। যোগ্য সহায়তা করল এদেশের প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দল। দেশ নতুনভাবে পরাধীন হলো, আরও একবার। এবার নিজের লোকেদের হাতেই। গ্রাম নিঃস্ব হতে শুরু করল। যেটুকু যা বেঁচে-বর্তে ছিল সেই শেষ সম্বলে আঘাত হানলসবুজবিপ্লব। গালভরা একটা নামের আড়ালে মূলত আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের মৃগয়াক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হল আমাদের গ্রামগুলিকে। কৃষকের হাত থেকে বীজ, সার সব গেল। প্রায় দশ হাজার বছরের কৃষিজ্ঞান, যা আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী ভূখন্ডে পরিণত করেছিল, এবার সেটাকে একেবারে শেষ করে দেওয়ার এক বীভৎস পরিকল্পনা নেওয়া হল। উৎপাদন বৃদ্ধির নামে, মূলত ব্যবসায়িক স্বার্থে পরবর্তীতে, দেশী বিদেশী কর্পোরেটদের স্বার্থে এদেশের সব গ্রাম লুট করার কাজ তরান্বিত হল। প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য রেখে দেওয়া হল বিষ। পুষ্টির প্রশ্ন গোল্লায় গেল। পাশাপাশি নেমে এল এক তীব্র সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, যা প্রতিটা গ্রামজীবনকে ভেঙেচুরে দিতে থাকল। জাত-পাত-ধর্ম-লিঙ্গের বিভেদে জেরবার ভারতীয় সমাজে এই আঘাত হল মারাত্মক। আমরা প্রায় সব হারালাম। আমাদের প্রত্যেকের নিয়ন্ত্রণ চলে গেল কর্পোরেট ও তাদের রাজনৈতিক ম্যানেজারদের হাতে। সব দায় ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে একটা দেশ সবশেষে এসে তার নাগরিকের খাদ্যের দায়িত্বও আর নিতে চাইছে না। বৃটিশরা যে লুট শুরু করেছিল, সেই লুটের কাজ কয়েক হাজারগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গ্রামের মানুষ প্রচন্ড অপুষ্টির শিকার। শহরের তথাকথিত শিক্ষিত জনতা যারা পুষ্টি নিয়ে খানিক সচেতনতার দাবি করেন, আমাদের বলতে দ্বিধা নেই তারাও কর্পোরেটের তৈরি করা বাজারি পুষ্টির ধারণাতেই বিশ্বাস করেন।

এই পরিস্থিতিতে আগামী প্রজন্মের খাদ্যসুরক্ষা নিয়ে আমরা আতঙ্কিত। খাদ্য নিয়ে বেলাগাম কর্পোরেট লুটের যে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে, তার বিরূদ্ধে বাজারের বাইরে গিয়ে কার্যকরী গণউদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে আমরা মনে করি না। আমাদের ভরসার জায়গা এখনও বহু কৃষকের হাতে থেকে যাওয়া জমিগুলি। যেগুলিও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, ধাপে ধাপে চলে যাচ্ছে কর্পোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণে, যাদের লক্ষ্য শুধু মুনাফা, মানুষ খেতে পাক কি না পাক, প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাক কি না পাক তা নিয়ে এদের কোনও দায় নেই।

শুধু এই কথা গুলি বলে কাজ হওয়ার পরিস্থিতি আজ আর নেই। কার্যকরী অর্থনৈতিক গণ-বিকল্প গড়ে তুলে এদের থামাতে না পারলে আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা অপরাধী হয়ে থাকব। বিষ খাওয়ানোর দায় নিয়ে আমাদের চলে যেতে হবে। আমরা জানি একাজ খুব সোজা না। তার মূল কারণ আমাদের সমাজের প্রচন্ড একা একা বাঁচার প্রবণতা, যা মূলত পুঁজিবাদী অর্থনীতির দার্শনিক ভিত্তি। সমাজকে বাদ দিয়ে ইন্ডিভিজুয়ালের জয়গান গাইতে গাইতে, ৯৯% মানুষকে কীভাবে লুট করতে হয় এই ব্যবস্থা তা ভালো মতো জানে। এর বিরূদ্ধে দাঁড়াতে পারে একমাত্র বৃহত্তর সমবায়। পুঁজির লুটের বিরূদ্ধে যা একমাত্র অর্থনৈতিক বিকল্প, যে বিকল্প মুনাফা নয়, পরিচালিত হয় মানবিক সহযোগিতার হাত ধরে।

কেমন হবে গণসমবায়-এর রূপরেখা

গণসমবায় উদ্যোগের একদিকে বিভিন্ন কৃষক, পুষ্টি বিশারদ, বিজ্ঞানী, উৎসাহী, শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবক, উৎপাদক গোষ্ঠী, ফার্মারস ক্লাব, ফার্মার্স প্রোডিউসার কোম্পানি অন্যদিকে বিভিন্ন ছোট ছোট ব্যবসায়িক উদ্যোগ, কনজিউমার্স কমিউনিটি, বিভিন্ন ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক। এই যৌথমঞ্চ খাদ্যপণ্য নিয়ে মুনাফা কেন্দ্রিক ও প্রকৃতি বিরূদ্ধ যে কোন পদ্ধতি ও লেনদেনের তীব্র বিরোধী হবে। এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাগুলি তাদের নিজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসেব যেকোনও সময় পাবলিক অডিটের প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে রাজি থাকবেন। খাদ্যপণ্য ছাড়া বাকি অন্যান্য ক্ষুদ্র গ্রামীন উদ্যোগ নিয়ে যে অর্থনৈতিক লেনদেন এই মঞ্চের মাধ্যমে পরিচালিত হবে সেগুলিও যাতে স্বচ্ছতার সাথে পরিচালিত হয় তার জন্য দায়বদ্ধ থাকবে।

উৎপাদন কী? মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াই বা কেমন হবে?

কৃষিক্ষেত্রে সমস্ত উৎপাদনের একটা সাধারণসূত্র আছে। জমিরমূল্য। সার, বীজ ইত্যাদির উৎপাদন খরচ। শ্রমের মূল্য (এর মধ্যে পারিবারিক শ্রমকে ধরতে হবে)। আনুসাঙ্গিক আরও ছোট বড় নানা খরচ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগপোকার আক্রমণে ফসল নষ্ট হলে তার দাম। এখন আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী কোনও কৃষক বা গ্রামীন ক্ষুদ্রশিল্পের উৎপাদক, ফসল উৎপাদন, পশুপালন বা মাছ চাষ এই সব কোনও ক্ষেত্রেই এভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়াকে খেয়াল রাখেন না। তারা মূলত বাজারের দেওয়া দামের উপর নির্ভর করেন। ক্রেতাও জিনিস কেনার সময় এই দায় নিয়ে উপস্থিত থাকেন না যে, যে ফুলকপিটা তিনি ৫ টাকা খুচরো দামে কিনলেন, তার দ্বারা কৃষকের উৎপাদন খরচটুকু উঠছে কিনা। দুক্ষেত্রেই বিষয়টা সমস্যার। উৎপাদন খরচের উপর ভিত্তি করে দাম না দিলে ক্ষতি আসলে ক্রেতার, বাজারে দাম বেশি থাকলে তাকে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বাজারে দাম কম থাকলে তিনি আপাতত কমে পাচ্ছেন। কিন্তু কৃষক অর্থাৎ তার জন্য যিনি ফসল ফলান তিনি দুর্বল হচ্ছেন। যা আসলে কর্পোরেটদের আসার রাস্তা প্রশস্ত করছে। কৃষক দুর্বল হতে থাকলে কর্পোরেটদের জাল বেছাতে সুবিধে হবে। কৃষক ও ক্রেতা দুইই কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণে আসবে। ফলে এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে সারা বছর বিভিন্ন কনজিউমার কমিউনিটি তৈরি করে সরাসরি কৃষককে ন্যায্য দাম দিয়ে ফসল কিনে নিলে দুঅংশই লাভবান হবে। এক্ষেত্রে বাজার নয়, নির্ভর করতে হবে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের উপর। যা আজকের দিনে কোনও সমস্যাই  নয়। ফসল উৎপাদনের শুরু থেকে ফসল তোলা পর্যন্ত এক ধরণের যোগাযোগ এই কমিউনিটিগুলির মধ্যে গড়ে তোলা ও তার ভিত্তিতে লেনদেন চালাতে হবে।

এবার খুব স্বাভাবিকভাবেই এই প্রক্রিয়া একদিনে গড়ে উঠবে না। কারণ আপাত তাৎক্ষনিক লাভের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শেখা কনজিউমার- মানসিকতা এই প্রক্রিয়ায় গুরুতর বাধা হয়ে থাকবে। তবে এটুকুও নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে কৃষকের সাথে সরাসরি লেনদেনে সবসময় কনজিউমারদেরই লাভ। এই প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এক বা একাধিক ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের সাহায্য লাগবে। যাদের কাজ হল এই লেনদেনের গোটা প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা।

ডিস্ট্রিবিঊশন নেটওয়ার্ক বা বিতরণ ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করবে?

খুব সোজা। মনে করা যাকনিলীমা আবাসনবলে দক্ষিণ কলকাতায় একটি আবাসন আছে। তাদের মধ্যে ২০ জন উপভোক্তার একটি কমিউনিটি তৈরি হল। এরকম আরও ৫টি জায়গায় কমিউনিটি গুলি তৈরি হল। অন্যদিকে গ্রামের বিভিন্ন উৎপাদকদের সাথে এই কমিউনিটিগুলি গণসমবায় উদ্যোগ-এর মাধ্যমে আগে থেকেই পরিচিত হয়ে আছেন। এবার উক্ত কনজিউমার কমিউনিটির যা যা জিনিস দরকার, দেখা গেল তিনটি জেলার আলাদা আলাদা গ্রাম থেকে তা এলে, তাদের প্রায় সমস্ত কিছুর চাহিদাই মিটে যাচ্ছে। এই কমিউনিটিগুলি তাদের প্রয়োজনের সমস্ত জিনিসের অর্ডার সংশ্লিষ্ট কৃষকদের পাঠিয়ে দেবেন। চাইলে তার দরদামও করতেপারেন। কৃষকরা অর্ডার অনুযায়ী সমস্ত জিনিস প্রাকৃতিক উপায়ে গুছিয়ে রাখবে, এবার ডিস্ট্রিবিউশন বা সাপ্লাইচেন পরিচালনাকারী সংস্থার দায়িত্ব হল এই কমিউনিটিগুলির কাছে, সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন ধরে এই জিনিসগুলি পৌঁছে দেওয়া। যার গুণগতমান ইত্যাদির দায় সাপ্লাইচেন ম্যানেজমেন্ট সংস্থাটি নেবে না। দায়ভার পুরোপুরি কৃষকদের উপর বর্তাবে। এই কৃষকদের সাথে কমিউনিটিগুলি সরাসরি যোগাযোগ রাখবে। এখানে কোনও গোপনীয়তার প্রশ্ন নেই। সাপ্লাইচেন ম্যানেজমেন্ট শুধু ওজনের দায় নিতে বাধ্য থাকবে। একটা সাধারণ হিসেবে দেখা গেছে ১০০ কিমি দূরবর্তী কোনও এলাকা থেকে ১০ কেজি পরিমাণ জিনিস কারও বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে মোট ৫৫ টাকা খরচা হয়। অর্থাৎ কিলো প্রতি ৫.৫০টাকা। কিন্তু এটা তখনই সম্ভব যখন মোট অর্ডারের সংখ্যা ১০০টি। অর্থাৎ ৫টি এরকম কমিউনিটি সহজেই এই অর্ডার দিয়ে দিতে পারে। এবার জিনিস অনুযায়ী এই দর খানিক কম বেশি হতে পারে।

একজন ব্যক্তির পক্ষে কেন কোনওভাবেই এই ব্যবস্থার সুফল নেওয়া সম্ভব নাউপভোক্তাদের জোট কেন দরকার?

আসলে এই প্রশ্নটিই গোটা এই গণ-বিকল্পটির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। বিষয়টি মূলত তিন ভাবে আলোচনার দাবি রাখছে।

এক, একজন ব্যক্তি উপভোক্তা ও একজন ব্যক্তি উৎপাদকের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট দ্বন্দ্বই মূল সমস্যার কারণ। এখানেই পুঁজির চলাচল। এখানেই মুনাফার খেলা। এটা খুব সহজেই বোঝা যাবে যদি আমরা একটা উদাহরণ ধরে আলোচনা করি। ধরা যাক, দক্ষিণ ২৪পরগণার, পাথরপ্রতিমা ব্লকে রমেশ মন্ডল বেগুন চাষ করেছেন। তার প্রতি সপ্তাহে মোট ১০০ কেজি করে বেগুন উৎপাদিত হয়। এখন কলকাতায় শ্যামবাজারে থাকা অলোক মন্ডল নামক কোনও এক উপভোক্তা রমেশ বাবুর কাছ থেকে সরাসরি বেগুন কিনতে চান। সেক্ষেত্রে কখনই এটা সম্ভব না। একদিন শখ করে রমেশ বাবু দিয়ে যেতে পারেন বা অলোক বাবু একদিন বেড়াতে গিয়ে নিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু দৈনন্দিন প্রক্রিয়ায় এটা বাস্তবোচিত পদ্ধতি কখনই নয়। কারণ রমেশ মন্ডলকে ১০০ কেজি বেগুন বিক্রি করতে হবে। আবার অলোক মন্ডল ১০০ কেজি বেগুন একা কিনতে পারবেন না। ফলে সহজ সমাধান হল, অলোক মন্ডল তার পাড়ায় বা পার্শ্ববর্তী এলাকায় এরকম ১০০ জন অলোক মন্ডলকে এক জোট করলেন। তাদের প্রত্যেকের প্রয়োজন এক জায়গায় করলে সেটা রমেশ মন্ডলের কাছে ১০০ কেজি হয়েই পৌঁছবে।

দুই, এখন এই কমিউনিটিগুলি খুব অল্প দূরত্বে গড়ে ওঠা দরকার। না হলে পরিবহণ খরচ এমন ভাবে বেড়ে যাবে ও বিতরণ ব্যবস্থাও এত অবিন্যস্তভাবে পরিচালিত হবে যা একজন উপভোক্তার দিক থেকে সমস্যার।

তিন, এই ধরণের উপভোক্তা জোট বা কনজিউমার কমিউনিটিগুলি নিজেদের মধ্যেও যোগাযোগ রেখে চলবে। যাতে তারা আরও বেশি পরিমাণ পুঁজির মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে। পারস্পরিক সহযোগিতা পুঁজিকে মাত্রা ছাড়া মুনাফা করতে দেবে না। এই ধরণের জোটগুলি বাজারের উপরেও এক ধরনের প্রভাব ফেলবে। মোদ্দায় ফাটকা পুঁজির চলাচল বন্ধ করার এছাড়া আর কোনও উপায় আমরা জানিনা। ভালো করে ভেবে দেখুন, কর্পোরেটরা এই কাজটাই করছে। গোটা উপভোক্তা অংশটিকে তারা তাদের ব্যবস্থায় এনে এক ভাবে মুনাফার স্বার্থে ব্যবহার করছে। সেখানে মূলত বাজার, বিজ্ঞাপণ, বাড়তি সুবিধে ইত্যাদি দিচ্ছে। উপভোক্তা আরও আরও উৎপাদন তথা কৃষকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। কৃষক ও উপভোক্তা বেশি বেশি করে এই কর্পোরেটদের উপরই নির্ভরশীল হচ্ছে। আমাদের সম্মিলিত পুঁজিই কর্পোরেটরা ঘুরপথে ব্যবহার করে। মুনাফা বাড়ায়। কারণ আমরা বিচ্ছিন্ন বলে।

ফলে এই কারণ গুলির জন্য, নিজেদের সুবিধের স্বার্থেই জোট বাঁধতে হবে। গোটা প্রক্রিয়াকে গণ-নজরদারির আওতায় আনতে গেলে এটা ছাড়া উপায় নেই। তবে এই প্রক্রিয়া সরকারগুলিরই গ্রহণ করার কথা ছিল। যা কোনও সরকারই করছে না বা করবে বলে মনে হয় না। কারণ এখন সরকারগুলি কর্পোরেটদের স্বার্থে শুধু নয় কর্পোরেটরাই মূলত সরকার পরিচালনা করে।

খাবার বা পুষ্টি নিয়ে কি আমরা সচেতন?

না। শহর গ্রাম কোনও অংশের মানুষই খাবার নিয়ে বা পুষ্টি নিয়ে ভাবেন না। দেশের ৯০% মানুষের এ নিয়ে ভাবার সময়ই নেই। তারা পেটটা ভরছে কিনা সে নিয়েই হিমসিম খাচ্ছে। খিদে তাদের কাছে পুষ্টির থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বাকি সুবিধাভোগী শহুরে মধ্যবিত্ত অংশ নানাকিছু নিয়ে ভাবেন।তবে খুব কম ভাবেন খাবার নিয়ে। এই অংশ মূলত ব্র্যান্ডের উপর বিশ্বাস রেখে চলেন। যা বিশ্বায়িতপুঁজির তৈরি করা বড়সড় ধাপ্পা ছাড়া আর কিছু না। এক ধরনের মেকী সচেতনতার দ্বারা এরা প্রভাবিত। আসলে গ্রাম শেষ হয়ে যাওয়ার পর, খাবার নিয়ে ভাবাও প্রায় শেষের মুখে।সবুজবিপ্লবসবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে আমাদের পুষ্টিতে। এই বাংলায় আগে কয়েক হাজার ধানের প্রজাতি ছিল। যে ধানের বীজ কৃষকরা রেখে দিতে পারতেন। প্রাকৃতিক উপায়েই তার চাষবাস হতো। ধান থেকে চাল তৈরির ঘরোয়া যে উপায় ছিল, তাতে চালের পুষ্টিগুণ বজায় থাকত। আয়রণ ঘাটতি, ফাইবার ঘাটতির মতো সমস্যা প্রায় ছিল না। গ্রামের মহিলারা এই পরিমান অ্যানিমিক ছিলেন না, প্রায় ৬০% মহিলাদের ডিম্বাশয়ে সিস্ট, ডায়াবেটিস, ব্লাডপ্রেসার ইত্যাদি অসুস্থতার সাথে সরাসরি এই হাইব্রিড প্রজাতির ধান থেকে তৈরি চালের ভাত খাওয়ার অভ্যেস সরাসরি দায়ী, যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। অথচ মজার বিষয় কী জানেন? গ্রামের মানুষ যে চাল অনায়াসেই খেয়ে তাদের পুষ্টির ঘাটতি মেটাত, সেই ধানের বীজ কেড়ে নেওয়া হল, হাইব্রিড বীজের ব্যবসা হল। তার সাথে সাথে এল কীটনাশক। রাসায়নিক সার। প্রজাতিগুলি শেষ হল। ধান ক্ষেতে বর্ষাকালে অনায়াসে যে সমস্ত দেশী মাছ যেমন কই, শিং, মাগুর পাওয়া যেত, যা গ্রামের মানুষের পুষ্টির সমস্যা মেটাতো অনায়াসেই, সেসবও গেল, জাস্ট মরে গেল সব। পোকা শেষ হল।পাখি কমলো। ফলের গাছ কমলো। ভিটামিন ডেফিসিয়েন্সি শুরু হল। গ্রামে ভিটামিনের ট্যাবলেট বিক্রি বাড়ল। ওষুধ কোম্পানীর রমরমা। আর আজকে সবশেষ করে দিয়ে শপিংমলের তাক থেকে বা কর্পোরেট ফান্ড নিয়ে চলা এনজিওদের থেকে ব্রাউন বা ব্ল্যাক রাইস কিনতে কিনতে শহুরে একদল মানুষ মনে করেন, আহা আমি একটু অর্গ্যানিক খেলাম! ফলে ভেবে দেখতে হবে আবার। ধবধবে চকচকে জিনিস? না পুষ্টি? গোটা জীববৈচিত্র ধ্বংস করে দিয়ে আজকে কর্পোরেটগুলি গ্রামে গ্রামে জৈবচাষের বানী শুনিয়ে বেড়াচ্ছে। খাবারের প্রশ্নেও এরা দুধরণের নাগরিক তৈরি করেছে।বড়লোক মধ্যবিত্তরা ভালো খাবার খাবে, তাদের জন্য জৈব চাষ আরও কত কি! আর বাকিদের জন্য জিএম (genetically modified) ফসল চাষ হবে। ফলে ভেবে দেখুন কিভাবে দেখবেন এই বিষয়টা? গ্রাম তথা কৃষকদের রক্ষা না করতে পারলে আপনার সন্তানের পুষ্টি ও বিঘ্নিত হবে। আমরা গ্রাম থেকে দুবেলা যা শুষে নিচ্ছি তার কতটা গ্রামে ফেরাচ্ছি? কিছু অবশিষ্ট থাকবে তো আর?

এই সময় জৈব বা প্রাকৃতিক চাষ

সবুজ বিপ্লবের হাত ধরে, মুনাফা কেন্দ্রিক ও রপ্তানি নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার দৌলতে, দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নকে জলে ফেলে দিয়ে এখন যে অবস্থায় আমাদের এনে ফেলা হয়েছে, তার থেকে ঘুরে দাঁড়াতে কত বছর লাগবে আমরা জানি না। এখনও সরকারি তরফে নীতির কোনও বদল নেই। এখনও মাটিকে এরা টাকা লুট করার জিনিস হিসেবে দেখে, প্রাণের আধার হিসেবে নয়। কৃষক তার সমস্ত শক্তি হারিয়েছে। তার কাছে হাজার বছরের জ্ঞান নেই আর। তার কাছে তার নিজের বাপঠাকুরদার হাতে অত্যন্ত বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে তৈরি করা প্রকৃতি নির্ভর বীজ নেই আর। মাটিতে জীবানুগুলো মেরে ফেলা হয়েছে, যেগুলি গাছের জন্য পুষ্টি এনে দিত। সার কীটনাশক কোম্পানির এজেন্টরা কৃষিসংক্রান্ত জ্ঞান দিয়ে বেড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো কৃষিজ্ঞান জীবন ধ্বংসের কাজ করে। চাষবাসকে সেই কবে থেকে একটা অত্যন্ত নিচু স্তরের কাজ হিসবে দেখতে শেখানো হয়েছে। আর শহরে এসি চালিয়ে, গাড়ির তেল পুড়িয়ে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিসপত্র কিনতে থাকার ও প্রকৃতিতে দায়িত্বহীনভাবে কোটি কোটি জঞ্জাল ফিরিয়ে দেওয়ার জীবনকে সেই কবে থেকে মহিমান্বিত করা হয়েছে। এর ফল আমরা পাচ্ছি। শিল্পকেন্দ্রিক, জীবাশ্ম জ্বালানি কেন্দ্রিক সভ্যতা আমাদের কেমন জীবন দিতে পারে, করোনা তার একটা ঝলক। দুই মেরুর বরফ গলছে। এখনও অনেক দুঃখ বাকি আমাদের কপালে।

খাদ্যে স্বনির্ভর কৃষি-বাস্তুতান্ত্রিক অঞ্চল, সেখানকার মানুষ, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার শেষ উপায় হিসেবে আমাদের মনে হয়, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে দাঁড়িয়ে আবার নিজেদের মধ্যে খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনগুলির একধরনের আদান প্রাদন গড়ে তোলা জরুরী। পুঁজির পরিবর্তে প্রাণের আদান প্রদাণ গড়ে তোলা। গ্রাম জীবনে নগদ-নির্ভরতা কমানো। ঋতু ভিত্তিক ফসলের চাষ। মাটির নীচের জল কম খরচ করা। জঙ্গল বাঁচিয়ে, সরল সাধারণ জীবনে ফেরা।

তবে এই দায় একা কৃষকের না। এই পরিস্থির জন্য রাষ্ট্রই দায়ী। কোন উপভোক্তা যদি চান তিনি রাসায়নিকও কীটনাশকমুক্ত ফসল বা মাছ মাংস খাবেন, তাহলে তাকে সংশ্লিষ্ট কৃষকের সাথে একধরনের যোগাযোগে যেতে হবে।নাকি টাকার জোরে, দায়হীনভাবে অর্গ্যানিক জিনিস তিনি খাবেন? মনে রাখতে হবে তার খারাপ প্রভাবের হাত থেকে তিনি নিজেও রক্ষা পাবেন না। অর্থাৎ দেশের ৯০% মানুষ সার কীটনাশক খেয়ে গেল আর আমি টাকার জোরে আমার শহুরে প্রিভিলেজের জোরে পাঁচটা এনজিও আর তিনটে কর্পোরেটের থেকে অর্গ্যানিক কিনে খেলাম, দাম নিয়ে ভাবলামই নাএই সুবিধাবাদী মানসিক অবস্থানে কোথাও পৌঁছানো যাবে বলে মনে হয় না। আমরা মনে করি, প্রকৃতি নির্ভর চাষ-বাস তখনই ফিরবে যদি আমরা প্রকৃতির কাছে মাথা নত করে ফিরতে পারি। সেই মানুষ গুলোর কাছে ফিরতে পারি যারা হাজার বছর ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমাদের খাইয়ে আসছেন।

ফলে সমস্ত মানুষেরই প্রকৃতি নির্ভর বিষমুক্ত ফসল পাওয়ার অধিকার নিয়েই লড়াই। জৈব উৎপাদনের বিষয়ে CSA (Consumer Supported Agriculture) মডেল গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যারা উৎসাহিত তাদের জন্য এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে। তবে যে কৃষকরা নিজেদের জোরে এখনও বিষমুক্ত ফসল ফলিয়ে যাচ্ছেন তাদের যোগাযোগ প্রকাশ্যে আসুক, যাতে যে কেউ তাদের থেকে সরাসরি জিনিস নিতে পারে।

---

এই লেখার সূত্র ধরেই ঋতব্রত ঘোষ পশ্চিমবঙ্গগণসমবায়উদ্যোগ মঞ্চ শুরু করেছেন। স্থানীয় উৎপাদন ও স্থানীয় বন্টনের উপর ব্যক্তিগত স্তরে পরিচিতি, উৎপাদক ও উপভোক্তা কমিউনিটিগুলির পারষ্পরিক সহোযোগিতা ও বিশ্বাসের উপর ভর করেই এই উদ্যোগ দাঁড়িয়ে উঠতে চাইছে। এই মেইল- যোগাযোগ করা যেতে পারে – peoplescooperativewb@gmail.com

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

উত্তরবঙ্গের হাতি আর মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান / স্বাতী রায় / ৩য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা

  উত্তরবঙ্গের হাতি আর   মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান স্বাতী রায় দৃশ্যটা প্রথম দেখেছিলাম উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক দূরে, উত্তরাখণ্ডের রাজাজী ...