চৌদ্দশাক
মাহিদী হাসান
আশ্বিন সংক্রান্তি, ভূতচতুর্দশী, চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখে চৌদ্দশাক খাওয়া তো আসলে সব রকম গাছপালা প্রাণ ও প্রাণীর হাল হকিকতের খোঁজ নেওয়া। 'চৌদ্দ' সংখ্যাটা এই দিক থেকে প্রতীকী মাত্র - নারীকে খবর নিতে হবে পুরুষ সারাবছর যে 'চাষ' করল তাতে অনাবাদি জাতি বা প্রজাতির কী অবস্থা দাঁড়ালো। চাষ করার অর্থ আবাদী ফসলের দিকে মনোযোগ দেওয়া, কিন্তু অনাবাদী ফসলের বিশাল ক্ষেত্র যেন তাতে নষ্ট না হয় বা গৌণ না হয়ে পড়ে তার জন্যই চৌদ্দ রকম শাক তোলা ও খাওয়ার রীতি চালু হয়েছে। চৌদ্দ রকম শাক পাওয়ার অর্থ হচ্ছে কৃষিকাজ পরিবেশসম্মত হয়েছে, কারণ কোন অনাবাদি শাক গৃহস্থের আলান পালান থেকে হারিয়ে যায় নি।
চৌদ্দ রকমের শাক একত্রে মিশিয়ে রান্না করে খেলে শরীরে রোগ ব্যাধি হয় না বলে গ্রাম বাংলার মানুষ বিশ্বাস করে। ঋতু পরিবর্তনজনিত রোগব্যাধির হাত থেকে বাঁচার জন্যও চৌদ্দশাক খাওয়া হয়। ঋষিরা ধর্মের মোড়কে বেঁধে দিয়ে গেছেন চৌদ্দশাক খাবার প্রয়োজনীয়তাকে।
"ওলং কেমুকবাস্তুকং সার্ষপঞ্চ নিম্বং জয়াং।
শালিঞ্চিং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলূকং গুড়ুচীন্তথা।
ভন্টাকীং সুনিষণ্ণকং শিবদিনে যদন্তি যে মানবাঃ
প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ।"
-কৃত্যকৃত্ত্ব /রঘুনন্দন।
শাস্ত্রে উল্লেখিত এই চৌদ্দশাক হল -
১. ওল - Amorphophallus campalunatus
২. কেঁউ - Cheilocostus speciosus
৩. বথুয়া - Chenopodium album
৪. কালকাসুন্দে- Senna Occidentalis
৫. সরষে - Brassica campestris
৬. নিম - Azadirachta indica
৭. জয়ন্তী - Sesbania sesbans
৮. শালিঞ্চে বা শিঞ্চে - Alternanthera sessilis
৯. গুলঞ্চ - Tinospora cordifolia
১০. পটল বা পলতা - Trichosanthes dioica
১১. শেলুকা - Cordia dichotoma
১২. হিলমোচিকা বা হেলেঞ্চা - Enhydra fluctuans
১৩. ভাঁট বা ঘেঁটু - Clerodendrum splendens
১৪. সুনিষণ্নক বা শুষনি - Marsellia quadrifolia
এছাড়াও বাংলায় আরও অনেক অনাবাদী অনাবাদী শাক পাওয়া যায়। যেমন আমরুল, কলমি, কুলেখাড়া, খারকোন বা ঘাটকোল, ব্রাহ্মী, ঢেঁকিশাক, নুনিয়া বা নুন খুড়িয়া, তেলাকুচা, দন্ডকলস, গিমা, থানকুনি, কাঁটানটে বা খৈরাকাটা, কচু, মালঞ্চ, কালমেঘ বা আলুই, বাসক, চুকোর বা টক ভেন্ডি, কস্তরী, মোরগফুল ইত্যাদি। জায়গাভেদে আরও নানা ধরণের শাক পাওয়া যেতে পারে। এইসব শাকের যে কোন চৌদ্দটি শাক কুড়িয়ে চৌদ্দশাক প্রথা পালন করা যায়। অনাবাদী অর্থাৎ নিজে থেকে হয়ে ওঠা শাক বাড়ীর আশপাশের পালান, খাল পুকুর ডোবার ধারে, রাস্তার ধারে, ক্ষেতের আলে এইসব শাক কুড়ানো হয়। অনেকসময় চৌদ্দশাক কুড়াতে মেয়েরা ১ থেকে ২ কিমি পথও পাড়ি দেন - খুব খুশি হন যদি এই দুরত্বের মধ্যে অন্তত চৌদ্দ রকমের কুড়িয়ে নিয়ে আসতে পারলে।
নারীকে খবর নিতে হয় প্রকৃতির যে অংশ অনাবাদী - যে অংশ কৃষি সংস্কৃতির সংরক্ষণ করে রাখার কথা তার, নইলে প্রাণের সংরক্ষণ ও বিকাশ হবে কি করে? আবাদ করতে গিয়ে আবাদী জায়গায় যেসব গাছপালা, প্রাণ ও প্রাণী কৃষক দমন করেছে, উঠতে দেয় নি, থাকতে দেয় নি, তারা সব কি ঠিকঠাক আছে? এই রকমের খাদ্যের প্রাপ্তি ও প্রাচুর্যতার মধ্য দিয়েও নারীরা বুঝে নেন তাঁদের গ্রামটি খাদ্য সার্বভৌমত্বের দিক থেকে নিরাপদ কিনা, এসব শাক যেন হারিয়ে না যায় তার প্রতিও তারা খেয়াল রাখেন।
চৌদ্দশাক রান্নার কোনও নির্দিষ্ট প্রস্তুত প্রণালী নেই। একেক জায়গায় একেক রকম ভাবে এই শাক রান্না করা হয়। আমিষ অথবা নিরামিষ যেকোনো ভাবেই এই শাক খাওয়ার রেওয়াজ আছে। এক্ষেত্রে কোথাও কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে, কোথাও রসুন-শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে, আবার কোথাও শুধু পাঁচফোড়ন দিয়েও চৌদ্দশাক ভাজা খাওয়া হয়। কোথাও কোথাও চৌদ্দশাক শুধুই ভাজা খাওয়া হয়, অনেকক্ষেত্রে আলু বা বেগুন দিয়েও ভেজে খাওয়ারও প্রচলন আছে।
তথ্যসূত্র:
১. চিরঞ্জীব বনৌষধি - আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য, ২. ভারতীয় বনৌষধি - ড.কালিদাস বিশ্বাস, ৩. বাংলাদেশ আগাছা পরিচিতি- বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ৪. পুষ্টি বাগান ও বাংলার শাক-সংস্কৃতি - ড. কল্যাণ চক্রবর্তী, ৫. উইকিপিডিয়া, ৬.আমাদের কুড়িয়ে পাওয়া শাক- উবিনীগ, ৭. বাঙলার শাক - ডিআরসিএসসি, ৮. প্রাযোগ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন