আম-সত্যজিৎ, ছালা-প্রান্তরের গা
স্রোতা দত্ত
ঔপনিবেশিক খোঁয়ারি (colonial hangover)-র বাবু-সংস্কৃতি বেচে আর কতদিন ভণ্ডামি চলবে? বা প্রশ্ন উঠুক, বিলিতি তত্ত্বের রোদচশমা চোখে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে জাহির-প্রিয় এ রাজ্যের নাগরিক, আর কত দিন রঙিন এ বুদবুদবাস? তার বদলে ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া, চক্ষু মেলিয়া স্বীকার করি না কেন, তুমুল পরিবর্তন ঘটেছে বহু ক্ষেত্রে। কায়েমি স্বার্থে তাকে অস্বীকার করে, পশ্চিমবাংলার মূলধারার ধ্বজাধারী বাবু কালচার তৈরি করেছে মেকি, প্লাস্টিক (প্লাস্টিক আর্ট নয় বরং গৌর ক্ষ্যাপার ‘প্লাস্টিক বাউল’ উক্তি দ্বারা অনুপ্রাণিত) / খেলনা কালচার যা আসলে ভিন্ন মাত্রার শোষণই।
“আমরা ‘সোনাঝুরি’ হাটে নাচি না। বাবুরা লজে ডাকলে যাই। হাটে যারা নাচে, তারা সাঁওতালি নয়।” শান্তিনিকেতনের কাছে পর্যটক-প্রিয় সোনাঝুরির হাটের কাছেই বনেরপুকুরডাঙা গ্রাম। ব্রিটিশ আমলে বাবুদের বিলাসবহুল বাড়িতে মুজরোতে যেতেন বাঈরা। স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছরে বদলেছে অনেক কিছুই। এখন প্রকাশ্যে বাঈনাচ হয় না। বিশ্বায়নের যুগে বাবু ও বিবি মিলে নানা কিসিমের পর্যটকী মজা করে।
এক শ্রেণির বাঙালির জন্য শান্তিনিকেতন পর্যটন সস্তায় পুষ্টিকর। বিশ বছর আগের সংযোজন, শাল সোনাঝুরির মাঝে, বাউল গান, কাঁথাস্টিচ, বাটিক, গয়না, খেলনা ছাড়াও কলসী মাথায়, লাল পাড়-সাদা/হলুদ শাড়ি পরে মাদলের তালে আদিবাসী নাচ! সব মিলিয়ে মূলত বহিরাগতের মনোরঞ্জনের জন্য রবিন্দো-আদিবাসী-বাউলের ‘টোটাল কালচারাল ককটেল’! কিন্তু এ জনগোষ্ঠীর নিজস্ব নাচের সঙ্গে তার মিল কতটা? ফারাকই বা কোথায়?
বছর দুয়েক আগে, বীরভূম লাগোয়া ঝাড়খণ্ডের এক শহরে টুসু পরবের মেলায় গেছিলাম। আশপাশের গ্রাম থেকে ট্রাকে করে এসেছে বড় বড় টুসু। প্রতিমার রং খয়েরি মেশানো গোলাপি। একাধিক ট্রাক ঘিরে চলছে নাচ। বেশির ভাগ ছোকরা নাচিয়ের মাথায় ঘুরিয়ে পরা গলফ ক্যাপ। পরণে কেতার শার্ট, রিপ্ড জিন্স, পায়ে চটকদার স্নিকার, গলায় মেলার আয়োজকের দেওয়া আইডেন্টিটি কার্ড। ধমসা বা মাদল নয়, সিন্থেসাইজার ও ড্রামবিট যোগে লাউডস্পিকারে বাজছে সাঁওতালি গান। সংঘবদ্ধভাবে জটিল হিসেবের পদক্ষেপে অর্ধচন্দ্রাকারে ঘুরে ঘুরে সেই নাচে প্রত্যেকে ছন্দোবদ্ধ। ভিডিও করে রেখেছিলাম। দেখাতে এক বন্ধুর অবিশ্বাসী প্রশ্ন, “দুর্গাপুজোয় এমন নাচ হয় নাকি!” কারও মতে, “রীতিমতো মহড়া দিয়ে (যেন হাটের নাচ আপনিই আসে! মহড়ার দরকার হয় না!)! টুসু মূর্তি, পিয়ানো, স্যাক্সোফোন বাজনায় দীক্ষিত বাঙালি টুসু নাচে সিন্থসাইজার হজম করতে চায় না। টুসু মানে ছোট মূর্তি, হেঁটো ধুতি, মাথায় পালক – এই ধারণা নাগরিক মনে এখনও বহমান। নয়ের দশকের শুরুতেই ভারতে অর্থনৈতিক উদারতাকে কাছে টেনেছে। সেই অর্থনীতিও ট্রিকল ডাউন সূত্রে ফেলে সাঁওতালদের কাছে মোটরবাইক, অ্যান্ড্রয়েড দেখলে বাবুদের কর্তৃত্ব হারাই হারাই নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
রানি হেম্ব্রম সিয়ান থেকে সোনাঝুরি হাটে নাচতে আসেন। লাকড়া, মাদল, বাঁশি বাজনদার সমেত বার-চোদ্দ জনের দল। সরকারের দেওয়া শিল্পী কার্ডে মাসিক বরাদ্দ মেলে। নাচের পর বাবুরা দিলে তা উপরি। রানি জানালেন, “তা প্রায় বিশ বছর হল, এই হাট হচ্ছে। কলসী মাথায় আগে তেমন নাচ হতো না। ওটা নিয়ে নাচ দেখে বাবুরা আনন্দ পায়। মোবাইলে দেখিয়ে বলে, ‘এই নাচটা কর’ - তো আমরা করি। আমাদেরও আনন্দ হয়। এখন মাঝে মাঝে আমরাও মাথায় নিয়ে নাচি।” হাট বিষয়ে একটু খুঁটিয়ে প্রশ্ন করতেই বললেন, “আগে আমাদের ছোট ছেলেগুলো ওখানে জিনিস নিয়ে বসত। এখন ওদের হটিয়ে মুসলমানেরা জিনিস বিক্রি করে।”
হাট বিষয়ে প্রশ্নে বনেরপুকুরডাঙার একাধিক বাসিন্দা বাক্য বিনিময় এড়ালেন। আবার অনেকেই এক মেগা ধারাবাহিকের স্মৃতি খুঁচিয়ে রেখে বহিরাগতকে গ্রামের নাম বললেন পলাশবনি। সেই ধারাবাহিকের চরিত্রের ঝুটো বাড়ি দেখিয়ে টাকা আদায়ের ফিকিরও আছে। এই এলাকা বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সুবিধাজনক একটি স্পট। ফলে পর্যটক ছাড়াও আদান-প্রদানের পরিসর বিস্তৃত। নজর করলে দু’তরফেই সস্তায় ধান্দাবাজির ফন্দি চোখে পড়ে।
“এই নাম বদল গায়ে লাগে না?”
নাম না বলার শর্তে উত্তর- “আমরা তো জানিই। অন্যান্য গ্রামও জানে। তোমরা ওই নামটা শুনতে চাও তাই বলি। টোটোওয়ালারা রটিয়ে দিয়েছে এটা পলাশবনি। আমাদের তাতে কী? আমরা তো আমাদের গ্রামেই থাকি।” স্থায়ী হাট নিয়ে অভিযোগ বিস্তর তবে তা শুনছে কে? আপাত অনুকম্পার আড়ালে চিহ্নিত নিম্নবর্গীয়দের থেকে ফায়দা লোটায় একদল ভদ্রলোকবাবু যথেষ্ট দড়। “আমরা বলেছি, সপ্তাহে দুদিন নাচ হোক অসুবিধে নেই। কিন্তু সবদিন সকাল-সন্ধে ডুডুডুং ডুডুং ডুডুং মাদল কার ভালো লাগে? খালের ওপারে হরিণ, গাছের পাখিগুলোর কথা কেউ ভাবে না। প্রত্যেক দিন এক গানবাজনা আর ভালো লাগে না।” আক্ষেপ কাঁদন কিস্কুর। তবু বাবুদের মন ও মান রাখতে পাঁচ দিনের হাট। বাকি দু’দিন কোপাইয়ের ধারে। গুগলি ছাড়াতে ছাড়াতে নুড়কি মুর্মুর দুঃখ, শিল্পী কার্ডের আবেদন করে মেলেনি। বছরে চার থেকে পাঁচবার ওই শীতের সময় বাবুদের লজে নেচে উপরি আয়! একদিনে বার-চোদ্দ জনের দলের জন্য বরাদ্দ চার/পাঁচ হাজার! বাবুদের বিনোদনের বিনিময়ে কয়েক ঘণ্টায় একদল ভারতবাসীর বছরে রোজগার? সে অঙ্ক কষার দায় বাবুদের নয়।
সাঁওতালরা ডিজে/বক্স বাজিয়ে, লাল নীল আলো জ্বালিয়ে ফিল্মি কায়দায় নাচলে ‘গেল গেল’ রব তুলে ‘অন্য’ সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা রক্ষার দায় বাবুদের। তবে এ বিষয়ে বনেরপুকুরডাঙাবাসীদের সাফ জবাব, ‘বিয়েতে আনন্দ করতে সবাই একসঙ্গে ডিজে বাজিয়ে নাচে। তাতে অসুবিধে কোথায়?’ অবশ্য কিশোর রাহুল টুডুর চটজলদি সাফাই, “ওগুলো ভালো না। তাই তো বাঁধনায় ডিজে বাজে না।” বাবু কালচারের জন্য শীতাতপ নির্ভর বিলাসিতার আয়েস। সাঁওতালরা মাটিই কোপাক। তাতে দু’হাতে ফায়দা। এক দিকে return to innocence-এর সানগ্লাস দিয়ে ওদের প্রতি আহা উহু ও তদ্দজনিত দুঃখবিলাস। অন্যদিকে শিক্ষার আদানপ্রদান নয়, বরং প্রান্তিক চিহ্নিত করে শিক্ষিতদের বেছে দেওয়া বিশেষ পথে তাঁদের শিক্ষিত করে সুবিধাভোগের মসৃণ যাপন ।
হালের বাংলা ধারাবাহিকগুলোতে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, এক শহরতলী বা গেঁয়ো মেয়ের সারল্যজনিত ভিন্নতা প্রমাণে চটজলদি উপায় বে-শহুরে উচ্চারণ। বিভিন্ন নারীবাদী লড়াইয়ের মাধ্যমে চলনে বলনে তাকে মূলস্রোতে মিশিয়ে নেওয়ার নিরলস প্রচেষ্টা কি সেই রাজনীতিরই সাংস্কৃতিক প্রতিফলন নয় (অবশ্য বহু ভদ্রলোকবাবুর এই ধারাবাহিক ঘোষিতভাবে তীব্র অপছন্দের)? সেই তালিকাতে যুক্ত হয়েছে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত দুটি ছায়াছবির গান (শাল মহুয়া— ‘মহানন্দা’, টাপা টিনি—‘বেলা শুরু’)। মহানন্দা ছবিটি লেখিকা ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবীর জীবন নির্ভর। তাঁর সাহিত্য ও রাজনীতি নিয়ে একটা শব্দ খরচ না করেও প্রশ্ন করা যেতে পারে, হে এই ছবির গায়ক/গায়িকা সুরকার, গীতিকার, পরিচালক, কুশীলব ও প্রশংসাকারীরা, আর কতদিন মাদলের নামে ড্রাম বাজিয়ে, মেকি-গ্রাম্য বাংলায়, মাথায় পাতা গুঁজে ধেইনৃত্যকে আদিবাসী সংস্কৃতি বলে প্রচার এবং তার বিপণনে স্বার্থাণ্বেষণ জারি থাকবে? ‘আমি তোমাদেরই লোক’-এর মুখোশে এ লুণ্ঠন আর কত দিন?
অবশ্য তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে এই রাজনৈতিক দ্বিচারিতা অর্থনৈতিক উদারবাদের থেকেও পুরনো। আর তা কেবল দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমে আবদ্ধ এমনও নয়। কলকাতার কোনও কোনও কবি-সাহিত্যকি শাল-মহুয়া, হাঁড়িয়া দিয়ে চাঁইবাসা, ডালটনগঞ্জ, মারোমার বিখ্যাত করে তুলেছিলেন? তাঁরাও কি কারও চোখে ‘বাবু’? অথবা সত্যজিৎ রায় পরিচালিত অরণ্যের দিন রাত্রি-তে আদিবাসী দুল্লি কাকে/কাদের ‘বাবু’ সম্বোধন করেছিল?
এই পরিপ্রেক্ষিতে পর্যালোচনা করলে সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষে তাঁর শেষ ছবি আগন্তুক তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থনৈতিক উদারবাদ শুরুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এই ছবি মুক্তি পেয়েছিল। খুব সরলরৈখিক ব্যাখ্যায়-- ধ্বংসাত্মক হিংসা, সমাজনীতি, রাজনীতির বিস্তর কচকচানির বিপ্রতীপে সারল্য প্রমাণে এক ভূ-পর্যটকের জন্য মাদল, বাঁশি আর গানের সঙ্গে আদিবাসীরা নাচ উপস্থাপন করে। ভাবানন্দে ভেসে সেই নাচে পা মেলায় কলকাতার এক মহিলা। সে তানপুরা সহযোগে ‘বাজিল কাহার বীণা’ও গাইতে পারে। মিল আছে কিন্তু হায়! রায়বাবুর শৈল্পিক দায়বদ্ধতার এড়িয়ে তাঁর মতের বাণিজ্যকরণ ছাড়া বাঙালিবাবু আর কী পারে? তাই সাংস্কৃতিক আম হিসেবে রবীন্দ্রনাথের পরে রইলেন সত্যজিৎ রায় আর ছালা হিসবে প্রান্তিক ও প্রান্তরের প্রতীক সাঁওতাল।
--
স্রোতা দত্ত ইংরাজি সাহিত্যের ছাত্রী। সাংবাদিক ও সমাজ গবেষক।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন