সুন্দরবনে মধু অভিযান
শেখ আল-এহসান
সময়টা ছিল ২০২০ সালের ৯ জুলাই। করোনা তখন থাবা বসিয়েছে সারা বিশ্বে। অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম প্রাকৃতিক উৎস মধু। এই কারণে দেশে মধুর চাহিদা বেড়ে গেছে ব্যাপকহারে। আর সেই সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল দিতে শুরু করেছেন তাতে। আমাদের দেশে মধুর একটি বড় উৎস সুন্দরবন। প্রতি বছর সেখান থেকে শতশত টন মধু আহরণ করেন মৌয়ালরা। সেদিন গিয়েছিলাম মধু আহরণের জন্য মৌয়ালদের সঙ্গী হয়ে।
এপ্রিলের প্রথম দিন থেকেই সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের অনুমতি দেয় বন বিভাগ, ওই কর্মকান্ড চলে জুনের শেষ পযন্ত। হঠাৎ করেই সুযোগ ঘটে মৌয়ালদের সঙ্গে মধু সংগ্রহে যাওয়ার। পরিকল্পনা অনুযায়ী সঙ্গী হিসেবে ছিলেন মো. মনিরুল ইসলাম, মো. আবুল কালাম ও মো. ইব্রাহিম হোসেন। তিনজনই বনজীবী। আর অন্য তিনজন হলেন কয়রার স্থানীয় সাংবাদিক ইমতিয়াজ উদ্দিন, ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের খুলনা প্রতিনিধি দীপংকর রায় ও আমি।
ছোট একটি ডিঙ্গি নৌকায় আমরা ছয়জন কোনও রকমে বসে আছি। এর মধ্যে তিনজন মৌয়াল। ধারণক্ষমতার বেশি মানুষ ওঠায় একটু নড়লেই নৌকায় পানি উঠছে। তাই সবাই একপ্রকার রোবটের মতো চুপচাপ। তবে চোখ থেমে নেই সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। শুধু মুখ ছাড়া আর কিছু নাড়ানো বেশ দুস্কর। আমাদের যাত্রা শুরু হয় খুলনার কয়রা উপজেলার ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শাকবাড়িয়া নদী থেকে। ওই নদীর একপাড়ে লোকালয়, অন্যপাড়ে সুন্দরবন। নৌকা নিয়ে যাত্রার সময় নদীর জোয়ারের পানি ছিল বাড়তির দিকে।
মৌয়াল তিনজনের মধ্যে মনিরুল ও আবুল কালাম মধু সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। আর ইব্রাহিমের ওই কাজের অভিজ্ঞতা পাঁচ বছরের মত। তিনজনই বংশ পরশপরায় সুন্দরবনের মাছ ও মধু সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা অন্য সময় মাছ আর মধুর মৌসুমে নেমে পড়েন মধু সংগ্রহের কাজে। নৌকাতে কথা বলতে বলতেই এসব কথা জানান তাঁরা।
কথার ফাঁকে এগোতে থাকে নৌকা। বনের মধ্যের ছোট খাল দিয়ে একেবেঁকে নৌকাটি চলে যায় গেড়া নদীতে। সেখানেই আগে থেকে একটি মৌচাক দেখে রেখেছিলেন ওই মৌয়াল দলের সদস্যরা। প্রায় ঘন্টাখানেক নৌকা চলার পর গন্তব্যস্থলে পৌঁছাই আমরা। এরই মধ্যে সুন্দরবনের মধুর আদ্যপান্ত জানা হয়ে যায় ওই তিনজনের কাছ থেকে। গন্তব্যস্থলের কাছাকাছি বনের ধারে নৌকা ভিড়ান মনিরুল, সঙ্গে সঙ্গেই নেমে পড়েন কালাম। তখনো জোয়ারের পানি বাড়ছে। বনের মধ্যেই প্রায় একহাত পানি, আর পানির নীচে শুলো অর্থাৎ শ্বাসমূল। শ্বাসমূল যেন পায়ে না ফুটে যায় তাই বনের মধ্যে নামার আগে এক ধরণের প্লাস্টিকের জুতা পরে নেন তাঁরা। আমাদের জানানো হয় বনের মধ্যে প্রায় ২০ মিনিট হাঁটলেই দেখা মিলবে মৌচাকের। সঙ্গে ওই বিশেষ জুতা না থাকায় তাঁদের পিছন পিছন খালি পায়েই নেমে পড়ি বনের মধ্যে। এক পা ফেলতেই বোঝা যায় খালি পায়ে বনে হাঁটার বিড়ম্বনা। ঘন গাছপালা আর পানিতে তলিয়ে থাকা শ্বাসমূল থেকে পা বাঁচিয়ে হাঁটা খুব দুস্কর। অন্যদিকে বাঘসহ অন্যান্য হিংস্র প্রাণীর আক্রমণের ভয় তো রয়েছেই। চারদিকে গা ছমছম করা পরিবেশ। সামনে তাকিয়ে দেখি, মৌয়ালদের হাঁটার ভঙ্গীটা যেন এমন, সুন্দরবন হলো তাঁদের বাড়ির চিরচেনা পথ। এরই মধ্যে কালাম ও ইব্রাহিম চলে গেছেন মৌচাকের কাছে। আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন মনিরুল। তখনও আমরা বেশ খানিকটা দূরে। এরই মধ্যে কালামের কাছ থেকে সংকেত পাওয়া গেল মৌচাক রয়েছে। মনিরুলের সহায়তায় আরও একটু সামনে এগিয়ে দেখা যায় কালাম ও ইব্রাহিম দাঁড়িয়ে আছেন। কাছে যেতেই কিছুটা দূর থেকে আঙ্গুল উচিয়ে দেখান মৌচাকটি। চোখের সামনে মৌচাকের দেখা মিলতেই উবে গেল পায়ে শ্বাসমূল আর গায়ে গাছের খোঁচা খাওয়ার ব্যাথা। কাছে গিয়ে মোবাইল ফোনে ছবি তোলার চেষ্টা করতেই মৌয়ালরা সংকেত দিলেন বেশি কাছে যাওয়া যাবে না। যদি একবার মৌমাছি কিছু বুঝতে পারে তাহলে তাদের আক্রমণে চাক না কেটেই এলাকাছাড়া হতে হবে। অগত্যা কিছুটা দূর থেকেই ছবি তুলে সন্তুষ্ট থাকতে হল।
এরপর মৌয়াল তিনজন চাকে ধোয়া দেওয়ার জন্য দক্ষহাতে শুরু করলেন ‘কাড়ু’তৈরির কাজ। হুদো নামের একধরণের লম্বাটে শুকনো ঘাস জাতীয় গাছ আর তার চারপাশে কাঁচা গোলপাতা দিয়ে বেঁধে তৈরি করা হলো সেটি। ঠিক হলো মনিরুজ্জামান ও আমি যাব চাক কাটতে।
মৌমাছি যেন হুল ফুটিয়ে দিতে না পারে এজন্য একটু মোটা ট্রাউজার পরে নিলাম আমরা। মাথায় পরিয়ে দেওয়া হলো নেট। কাড়ুতে আগুন দিতেই ধোয়ায় আচ্ছাদিত হয়ে গেল এলাকাটি। এরপর সেটি নিয়ে সামনে সামনে চললেন মনিরুল। তাঁর কাঁধের সঙ্গে ঝুলানো মুখের উপরিভাগ কাটা একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম, তার মধ্যে রয়েছে একটি দা। ড্রামটি ঝুলিয়ে নেওয়ার সুবিধার জন্য দুই পাশে চারটি ফুটো করে দড়ি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। শ্বাসমূল সামলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম মনিরুলের পিছু পিছু। বেশ কিছুটা দূরে নিরাপদ আশ্রয়ে অন্যরা। মৌচাকের ঠিক নিচে যেতেই হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো কাড়ু। সেটির জ্বলন্ত মুখ নিচের দিকে ধরলে ধোয়ার মাত্রা বেশি হয়। আমাকে সেটি বুঝিয়ে দিয়েই গাছে উঠে গেলেন মনিরুল। ততক্ষণে ধোয়ার আঁচ পৌছে গেছে মৌচাকে, উড়তে শুরু করেছে মৌমাছি। শুরুতেই আমাকে ঘিরে ধরলো একঝাঁক। চাক থেকে মৌমাছি সরে যেতেই অনেকটা লাল মধু সমৃদ্ধ চাক ফুটে উঠে চোখের সামনে। পুরো চাকের চার ভাগের মাত্র একভাগে রয়েছে মধু। শুধু যেটুকুতে মধু আছে সেটুকুই কাটা হয়। এর আগে চাকের নীচে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল ড্রামটি। দা দিয়ে কাটতেই মধু সমেত চাকটি পড়ে ড্রামের মধ্যে। আর এ কাজটি করতে করতেই কাড়ু ধরে থাকা হাতে হুল ফুটিয়ে রাগের বহিপ্রকাশ ঘটায় কয়েকটি মৌমাছি। গাছ থেকে নেমে পড়তেই ড্রাম আর কাড়ু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটে যাই আমরা। কাড়ু ধরার অদক্ষতার কারণে কয়েকটি মৌমাছি হুল বসিয়েছে মনিরুলের গায়েও।
চাক নিয়ে আসায় আমাদের পিছু নিয়েছে শত শত মৌমাছি। তাড়া খেয়ে খালি পায়ে মাটিতে থাকা খাড়া খাড়া শ্বাসমূল মাড়িয়ে ছুটতে থাকি নৌকার দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকায় পৌছে যাই আমরা। ততক্ষণে হুল ফুটানো স্থানে যন্ত্রণা করতে শুরু করেছে। হয়ত হুল ফোটানোর সঙ্গে সঙ্গেই যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল কিন্তু চাক কাটার উচ্ছ্বাসে তা টের পাইনি।
নৌকায় উঠেই হাল ধরে দ্বিতীয় মৌচাকের দিকে চলতে শুরু করেন মৌয়ালরা। ড্রামের মধ্যে তাকিয়ে চাকসহ টাটকা মধু দেখেই মনটা জুড়িয়ে যায়। নৌকা চলতে শুরু করলেই নিজ হাতে চাকের কিছু অংশ কেটে মুখে পুরে দিই। জিহ্বা দিয়ে সেটি চাপ দিতেই পুরো মুখের মধ্যে ভরে যায় মধু। আহা কী তৃপ্তি!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন