শনিবার, ২৯ জুলাই, ২০২৩

COP 26 ও মহাদেব দা / অংশুমান দাশ / ২য় বর্ষ ২য় সংখ্যা

 

COP 26 ও মহাদেব দা

অংশুমান দাশ

 

সন্ধ্যে হয়ে এল। মহাদেব দা আর একটা বিড়ি ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল। শীতের হালকা কুয়াশার সঙ্গে সেই ধোঁয়া আর আলাদা করা যাচ্ছিল না। সারাদিন জলে জলে ধানকাটার পরে হাত-পায়ের চামড়া সাদা হয়ে কুঁচকে গেছে। অনেক ধান তোলা যায়নি। ধান মাঠেই পড়ে আছে তিনমাসের পরিশ্রম।

“প্রায় এমনই হইংছিল গেল বছর। তাই লয়? একদিন কি দু দিন ইদিক উদিক। আমি ঠিক সময়মত কাটিছিলম বলে কিছুদিন চলেছিল। সুনীলের ধান তো পুরোটাই মাঠেই পচল।”

প্রতি বছরই এমন হচ্ছে মহাদেব দা?

“ইবার দেখলি না – কত্ত দেরি করে আকাশের জল এল। ধান রুইতেই তো দেরি। তা আবার এখন…”

এই সব কিছু বদলে যাচ্ছে – জলবায়ু বদল। তাই নিয়েই তো সব দেশের মাথারা মিটিং করছিলেন।”

“জলও বটে বাতাসও বটে – সবই তো কেমন পারা হইং গেল দেখতে দেখতে। এদিকে ঝোরাগুলান রুখু হয়ে গেল – ওদিকে আকাশজলের আর শেষ নেই। কার্ত্তিক মাসের হিমেই তো ধানে দুধ আসত – তা কার্তিকে দেখি গরম ছাড়ে। এবছর বনে ছাতু ফুটে নাই। তা মিটিন তো করতেই হবেক। তা কী বললেক মিটিনে? সব আবার আগের মত হইং যাবেক?”

বলছে তো। তুমি আমি দেখে যেতে পারব না – তবে একদিন নাকি ঠিক হবে।”

“কী ঠিক হবেক বল দেখি?” মহাদেব দা নেভা বিড়িতে আবার আগুন দেয়। সারাদিন কোঁচড়ে থেকে মাঠের জলের ছিটেয় বিড়ি ভিজে গেছে। দেশলাইয়ের আগুনে মহাদেব দার উদাসীন চোখদুটোয় একবিন্দু দেশলাইয়ের আলোর ছায়া দেখা যায়। অবশ্য আলোর ঠিক ছায়া হয় কিনা জানি না। চোখে তো কোন কিছুর ছায়া পড়ে না – প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। তেমনি দেশলাইয়ের আলোর আলোটুকুই ফুটে ওঠে চোখের মণিতে।

“যদি পৃথিবীর গরম হয়ে যাওয়া কমাতে হয়, ওই যত ধোঁয়া বেরোচ্ছে গাড়ি ঘোড়া কল কারখানা থেকে তা নাকি ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৫% কমিয়ে দিতে হবে। তবে গড় তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রী বাড়ার মধ্যে রাখতে পারবে” - আমি বিড় বিড় করি – নিজের কাছেই যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না – তাই আমার গলা মহাদেব দার কান অবধি পৌঁছায় না। মহাদেব দা শোনার জন্য আমার কাছে এগিয়ে আসে। আমি সারাদিনের জলে ভেজার সোঁদা গন্ধ পাই মহাদেব দার গা থেকে।

“তা মোদী বাবু গেছিল? কী বইল্লেক?”

“অনেককিছু। সবাই বলছিল কয়লা পোড়ানো বন্ধ করতে – মোদীসাহেব জোরজার করে সেটাকে বন্ধ না করে কম ব্যবহারের কথা বললেন। সবাই বলল ২০৫০-এর মধ্য কয়লা বন্ধ হবে, মোদী বললেন ২০৭০।  বললেন সূর্যের আলো, হাওয়া এই সব থেকে কল কারখানা চলবে। এমনি পাঁচ দফা নানা পরকল্পনা দিয়েছেন”

“তা ৫০ই কী আর ৭০ই কী। আমার তো এখনি বয়স তিনকুড়ি পেরিয়ে গেছে। তা কয়লার উপরে এত রাগ কিসের?”

“কয়লা পুড়িয়েই তো বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে। আর সেই ধোঁয়ায় গরম বাড়ছে আরও। আর গরম বাড়ছে বলেই জল হাওয়া সব উল্টোপাল্টা হয়ে যাচ্ছে।”

“অ। তা বিদ্যুৎ কোথা? এই তো টিমটিম করে আলো জ্বলছে। কী নাকি সূর্যের আলো ধরার জন্যে প্লেট লাগানো এই রাস্তার আলো – তা তো রোদ নেই বলে জ্বলেনি। কিছু তো খারাপ। তার দাম এত – কে সারাবেক বল দেখি?”

কয়লার সস্তার বিদ্যুতে শহরে রাস্তা রাস্তায় অনাবশ্যক জ্বলবে আর এই বাঁকুড়ায় আসবে দামী সৌর বিদ্যুৎ। এই নিয়ে আমরা কয়লা খরচ কমাব – এই সোনার পাথরবাটির কথা ভেবে আমি চুপ করে থাকি। উত্তর পাওয়ার জন্য প্রশ্ন করে নি মহাদেব দা। সে আমিও জানি। আবার দ্বিচারিতার কথাও জানি। ওদিকে কয়লা পোড়ানো কমানোর কথা হবে, অথচ নতুন কয়লাখনি নিয়ে সাড়ম্বড়ে সরকারি ঢেঁড়া পেটানো চলবে। রাতের আকাশ ফুটো হওয়ার ছাতার মত মাথার উপর নেমে আসছে। এক একটা তারা যেন এক একটা ফুটো – একটা দুটো করে জেগে উঠছে। যে সব দেশের মানুষের ছাদ এই ছাতা – আর আলো ওই রাতের তারা – সে সব দেশের কী হবে? এ কথা মনে হতেই – নিজেকে মনে করাই, সে সব দেশে বৈষম্যেরশেষ নেই। রাতের শহর, দিনের শপিং মলে জ্বলে থাকার জন্যে ক্লা তোলার সম্মতি আদায় হল ২০৭০ অবধি, অথচ কাল থেকেই বন্ধ করে দেওয়া উচিত ছিল যত কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের উৎস।

“তা মিটিনে ওমনি অনেক কথা হয়।”

কী করে যেন ধরে ফেলেছে মহাদেব দা যে ২০১৫ প্যারিস এগ্রিমেন্টের ধারেকাছেও যেতে পারনি আমরা। মিটিং-এ সত্যিই অমন অনেক কথা হয়। ২০৩০এর মধ্যে কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা মানতে পারলেও গড় তাপমাত্রা ২.৪ ডিগ্রী বাড়বে – এমনও বলছেন কেউ কেউ।

“অনেক টাকাও দেবে বলেছে, মহাদেব দা।”

“কিসের ট্যাকা?”

“এই সব কলকারখানার যন্ত্রপাতি বদলে দিয়ে এমন করবে যে আর ধোঁয়া বেরোবেই না।”

“তাতে কি জল বদলাবে? আবার ঝোরাতে জল আসবে? আমাদের জঙ্গলের গাছগুলান ফিরত আসবেক? কে দিবে ট্যাকা?”

“ওই তো যাদের দেশে অনেক এমন গাড়ি ঘোড়া কারখানা, তারা দেবে যাদের নেই তাদের – যাতে তারা যেটুকু আছে সেটুকু বদলে ফেলে।”

“ভিক্ষা না ঘুষ? যাদের আছে – তারাই তো বদলাক বটে আগে। যাদের নেই তারা কী বদলাবে!”

এ প্রশ্নের উত্তর নেই আমার কাছে। তাই বলি, “সে অনেক টাকা। ১০০ বিলিয়ন ডলার।”

“সে টাকা পাবেক কে? সেই তো এম এল এ কালী সোরেন। “

“না গো- এসব সরকারি কাজে লাগবে। সরকার করবে। এ টাকা তোমার আমার কাছে আসবে না।” যদিও মনে মনে ভাবি – এই টাকা দেওয়ার কথা প্যারিস এগ্রিমেন্টেও হয়েছিল – কিন্তু আসেনি। দেব বলে না দিলেও কেউ জেলে যায় না – আর টাকা চুরি করলে তো যায়ই না! প্রতিশ্রুতি মাপার জন্য কোন আইন কানুন নেই। এবারেও ১০৯টা দেশ বলেছে ২০৩০এর মধ্যে ৩০% মিথেন নিঃসরণ কমাবে, ১৪১টা দেশ বলেছে জঙ্গল বাড়াবে। কিন্তু না বাড়ালেই বা দেখছে কে? আমাদের প্রধানমন্ত্রী কিন্তু জঙ্গল নিয়ে কিছু বলেন নি!

এই যে এ বছর ধানের জমিতে জল জমল – সেই কথা কি হল?” অন্ধকার আরও ঘন হয়েছে। মাঠের ধারে বটগাছ কালোর মধ্যে আরও কালো দেখাচ্ছে। প্রশ্ন জমে জমে ওমনি কালো অন্ধকারের মত হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়া ১.৫ ডিগ্রীর মধ্যে রাখার জন্য বছরে ২ গিগাটন কার্বন ডাই অক্সাইড কমানোর দরকার ছিল – ফি বছর, ২০৪০ অবধি। হয়নি। গত বছর ৫.৪% কমেছিল লকডাউনের জন্য, বছর আবার ৪.৯% কার্বন নিঃসরণ বেড়ে গেছে। ১% ধনী দেশগুলো এখনও ১৬ কার্বনের জন্য দায়ী। গরীব দেশরাও কম নয় – যার মধ্য ভারত আছে। আমাদের আরও উন্নয়ন দরকার – এই অজুহাতে কার্বন পোড়ানোর ছাড়পত্র দাবী করে দেশজুড়ে বৈষম্য বাড়িয়েই চলেছি – কার্বন কাঁর জন্য পুড়বে? চীন কয়লা পোড়ানো দ্বীগুণ করে ফেলেছে প্রায়।

হয়নি হয়নি হয়নি”, আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বলি।

অ তবে আর কী” মহাদেব দা বিড়ির শেটুকু ছুঁড়ে ফেলে দূরে। এখন আর মখ দেখা যাচ্ছে না। “নেতারা ওমনি বলবেক। বলবেকই। আমাদের ধান লাগাতেই হবেক – যার যা কাজ।”

৪৬টা দেশ বলেছে ২০৫০র মধ্যে কয়লা পোড়ানো বন্ধ করবে। আর ২৫টা দেশ বলেছে তার জন্য যা সাহায্য লাগে দেবে। বলেছে – এই অবধি। যদি না হয়, মহাদেব দার প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? যেমন প্যারিস এগ্রিমেন্টের ব্যর্থতার পরেও গ্লাসগোতে প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে গেল। কেন করা গেল না – সে নিয়ে পর্যালোচনার থেকে ধামা চাপা দেওয়াতেই নজর বেশি। যাদের ক্ষতি, যাদের ধ্বংস তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেওয়ার টাকার প্রতিশ্রুতি এল ৩৫৬ মিলিয়ন ডলার– সে টাকায় উন্নয়নের নামে লাক্ষাদ্বীকে শপিংমল বানিয়ে দেওয়া হবে না তো?

মহাদেব দা হেঁটে চলে যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে। আমরাও।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

উত্তরবঙ্গের হাতি আর মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান / স্বাতী রায় / ৩য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা

  উত্তরবঙ্গের হাতি আর   মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান স্বাতী রায় দৃশ্যটা প্রথম দেখেছিলাম উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক দূরে, উত্তরাখণ্ডের রাজাজী ...