শনিবার, ২৯ জুলাই, ২০২৩

বনশত্রু / হাসান হিমালয়/ ১ম বর্ষ ২য় সংখ্যা

 

পশ্চিমবঙ্গের দিকের সুন্দরবনে পর্যটক বাড়তে বাড়তে বছরে এক লক্ষ আশি হাজার। কর্মসংস্থান ও আয়ের দোহাই দিয়ে বছর বছর সরকারি বেসরকারি মদতে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা হোটেল, পর্যটকদের ফেলে আসা অজস্র আবর্জনা, নৌকার আওয়াজ ও দূষণ – এইসব সামলে কেমন আছে বাংলাদেশের সুন্দরবন? জানালেন হাসান হিমালয়।

 

নশত্রু

হাসান হিমালয়

 

যতই হেরিটেজ সাইটের তকমা পাক আর আমরা রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিয়ে বুক ফোলাই, উন্নয়নের নামে আগ্রাসন আর বনখেকো দৌরাত্ম্যের সঙ্গে সুন্দরবনের দিকে ধেয়ে আসছে 'পর্যটক' নামের নতুন বিপদ। প্রতিবছরই গড়ে ২৫ শতাংশ করে বাড়ছে পর্যটক। রাষ্ট্র নিজেই এই বিপদ বাড়াতে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সুন্দরবন রক্ষা কর্মসূচী চাপা পড়ে যাচ্ছে 'ইকো ট্যুরিজম', 'ট্যুরিজম ব্যবসায় হাজারো কর্মসংস্থান' এই সব টোপের আড়ালে এমনিতেই জলবায়ুর পরিবর্তনে নানা দূর্যোগে ক্ষতবিক্ষত সুন্দরবন, তার উপর আছে উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত সেতু, বাঁধ, বিল্ডিং। তার উপরে আবার পর্যটনের রমরমা - তেলদূষণ, বানিজ্যিক নৌযান চলাচলের মাধ্যমে শব্দদূষণ বছরের পর বছর চলছেই। এর সঙ্গে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য বনের গাছপালা ও প্রাণীকূলকে বিরক্ত করার আয়োজন চলছে এখন বছরের ৬ মাস ধরে

 

সুন্দরবনের পর্যটক আগ্রাসন নিয়ে গবেষণা হয়েছে বিস্তর। ২০১৬ সালের শেষের দিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ ও সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ অব সুন্দরবন পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে সুন্দরবনে যে পর্যটন ব্যবস্থা চলছে, তা কোন অবস্থাতেই সুন্দরবনবান্ধব নয়। আধুনিক মানুষ যেখানেই যায়, যন্ত্র ও বর্জ্যপদার্থের মাধ্যমে কিছু না কিছু দূষণ ঘটায়। এ কারনেই সুন্দরবনে পর্যটকসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছিলেন গবেষকরা গবেষণাটি জানিয়েছে, পরিবেশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সুন্দরবনের নয়টি পর্যটন কেন্দ্রে প্রতিদিন ৪ হাজার ২১৬ জন পর্যন্ত পর্যটক গ্রহন করা যেতে পারে। রাতে বনের ভেতরে জলযানে অবস্থান করলে এই সংখ্যা আরও কম হওয়া উচিৎ। অথচ প্রতিবছর শীত মৌসুমের কোনো কোনো দিন ৪৫ হাজার পর্যটকও সুন্দরবনে বিচরন করেন। ওই সময় গবেষকরা সুন্দরবনের ভেতরে জলযান ও পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পর্যটনের ক্যালেন্ডার এবং বনের ভেতরে মানুষের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে সফটওয়্যার বানানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সব প্রস্তাব চাপা পড়ে গেছে বানিজ্যিক দৃষ্টিকোন থেকে। বরং এই রিপোর্ট প্রকাশের পর সুন্দরবনে পর্যটক আরও বেড়েছে! ২০১৯-২০ অর্থবছরে  ভ্রমনকারীর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৭৯ জনে। এ থেকে বন বিভাগের রাজস্ব আয় হয়েছিল ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা সঙ্গের গ্রাফটি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা মানুষের হিসাব দেবে। আর তার মানে কতখানি আবর্জনা, সে হিসাব দিয়ে আর লেখা ভারাক্রান্ত করছিনা, তবে বলা বাহুল্য এই আবর্জনা গিয়ে পড়ছে ঐ নদীতেই।

 

 

পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে থাকায় বনকে ঘিরে পর্যটনকেন্দ্রিক তৎপরতাও বেড়েছে। বনের ভেতরে পর্যটকদের জন্য নতুন করে ৪ টি পর্যটন কেন্দ্র খোলার জন্য প্রকল্প নিয়েছে বনবিভাগ। প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পে নতুন ৪ টি পর্যটন কেন্দ্র ছাড়াও পুরাতন কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক কংক্রিটের স্থাপনা নির্মান করার পরিকল্পনা নিয়েছে বনবিভাগ। এর মধ্যে একশো বছরের পুরাতন প্রত্নসম্পদ  শেখেরটেকেও স্থাপনা নির্মানের পরিকল্পনা রয়েছে। এমনিতেই স্পর্শকাতর এই প্রত্নসম্পদ নদী ভাঙনে বিলীন হতে বসেছে। এর মধ্যে নতুন করে সেখানে স্থাপনা নির্মানে এর কিছুই আর থাকবে না বলে আশংকা করা হচ্ছে শেখেরটেক ছাড়া অন্য পর্যটনকেন্দ্র গুলো হচ্ছে; আলীবান্দা, কালাবগি ও কৈলাশগঞ্জ। এই পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যটকদের জন্য ওয়াচ টাওয়ার, ঝুলন্ত ব্রীজ, হাঁটার জন্য কাঠের তৈরী ফুট ট্রেইল, বিশ্রামাগার ও নৌযান থেকে ওঠানামা করার জন্য নদী পাড়ে জেটি নির্মান করা হবে। এসব স্থাপনা নির্মান হলে বনের এই অংশেও প্রাণী ও উদ্ভিদের বাস্তুসংস্থান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা আর বলে দিতে হবে না

 

পর্যটনের কারনে পরিবেশ ও প্রতিবেশের কেমন ক্ষতি হয় তার অন্যতম উদাহরণ কটকা অভয়ারণ্য। পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় জায়গা পূর্ব সুন্দরবনের কটকা। এক সময় এখানে বেড়াতে গিয়ে অসংখ্য চিত্রা হরিনের দেখা পেতেন পর্যটকেরা। বলেশ্বর নদী কেন্দ্রিক মিষ্টি পানির প্রবাহ, স্থানটি অন্যান্য এলাকার তুলনায় উঁচু হওয়ায় এবং চিত্রা হরিনের সংখ্যা বেশি থাকায় কটকা এলাকায় বাঘও আনুপাতিক হারে বেশি ছিলো। এখন সেটি পুরোটাই গল্প। এখন আর বাঘের দেখা মেলে না। মানুষের কাছ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে বনের গভীরে চলে যায় বাঘ ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা থেকে বন্যপ্রাণী বিষয়ক বন কর্মকর্তা মদিনুল আহসান, সকলেরই এক কথা - পর্যটকদের ভিড় বাড়ার কারনে চিত্রা হরিন আগের মতো দেখা যায় না, বাঘ তো নেইই।

 

সুতরাং এই শীতে যখন আপনি নৌকায় তারস্বরে মিউজিক বাজিয়ে, বগলে থার্মোকলের প্লেট নিয়ে কড়াইশুঁটির কচুরি খেতে আর স্থানীয় নাচগান দেখতে সুন্দরবন হাজির হবেন – মাথায় রাখুন আপনি আসলে এসেছেন প্রকৃতির কাছে আসার নাম করে। শহুরে আমোদ আহ্লাদের আদব কায়দা যতটা পারেন শহরেই রেখে আসুন। নিয়ম কানুন না মেনে সুন্দরবনের বারোটা বাজিয়ে দিলে আগামীদিনে আয় আর হবে কোথা থেকে? অতি লোভে সোনার ডিম পাড়া হাঁসকে মেরে ফেললে হাঁসও গেল, ডিমও গেল।

 

হাসান হিমালয়

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

উত্তরবঙ্গের হাতি আর মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান / স্বাতী রায় / ৩য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা

  উত্তরবঙ্গের হাতি আর   মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান স্বাতী রায় দৃশ্যটা প্রথম দেখেছিলাম উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক দূরে, উত্তরাখণ্ডের রাজাজী ...