শনিবার, ২৯ জুলাই, ২০২৩

পরিক্রমার ডায়েরি / রজত দাস/ ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা

বাদল সরকারের হাত ধরে তৃতীয় থিয়েটার – মুক্ত থিয়েটার। বাণিজ্য থেকে মুক্ত, মঞ্চ ও তার বন্ধন থেকে মুক্ত। থিয়েটার নিয়ে যেখানে সেখানে চলে যাওয়ার থিয়েটার। একটা পর্দা খাটিয়েই স্পার্টাকাস, রক্তকরবী, মিছিল – এর মত নাটক করার থিয়েটার। আশির দশকে তৃতীয় থিয়েটার শুরু করে পরিক্রমা – গ্রামে গঞ্জে আনাচে কানাচে। এখনও তা চলেছে। রজত দাস লিখলেন এই পরিক্রমার দিনলিপি।

পরিক্রমার ডায়েরি

রজত দাস

 

আমার বন্ধুরা ছাদেই শুতো রাতে। আমার বন্ধুরা আকাশে শুতো রাতে। আমি স্কুলের বিছানা থেকে বেড়িয়ে এসে একা দাঁড়িয়ে থাকতাম। অন্ধকারে। এমন ঘোর রাত্রি। নিশি। নিশি নাকি পিছু ডাকে। আমি আকাশে, ছোট ছোট ফুটো হওয়া অন্ধকারে, নিশির ডাক শুনতাম। আমার বন্ধুরা আকাশে ঘুমিয়ে তখন। আমি চোখ বুজি। বুজেই বুঝতে পারি, এই এত বড় আকাশ আর পৃথিবী আর এই অন্তহীন নিঃশব্দে চোখ বুজে রাখা আর চোখ খুলে রাখার মধ্যে আদতে কোন ফারাক নেই।

...

আমরা সকলে স্থির হয়ে চুপ করে আছি। শব্দ শুনছি। না-মানুষের শব্দ। শব্দ না হওয়ার শব্দ। যে শব্দ দেশান্তরিত হয়েছে কবে। আলো নেই কোনো। অন্ধকার। আর অনেক অনেক তারার মধ্যে সপ্তর্ষিমণ্ডল। লুব্ধক। জোনাকি। ১৭ কিলোমিটার দূরের হ্যালোজেন ক্ষীণ হয়ে জানান দিচ্ছে কেবল, নাগরিক হতে আমাদের ঢের আপত্তি আছে।

হঠাৎ দূর থেকে বাঁশির ডাক। সে ডাক এগিয়ে আসছে ক্রমশ। মোড়লের বাঁশি। আমরা সকলে মোড়লমশাইকে ছুঁয়ে দিই। আর তক্ষুনি কারা যেন মাদল বাজাতে থাকেন। স্কুলের ছোট্ট উঠোন ভরে যায়।

তারপর নাচ গান নাটক। এভাবে চারটে দিন।

...

একদিন বৃহস্পতিবার। গ্রামের ঘরগুলো, মেঝে উঠোন ভরে গেল রঙে, আলপনায়।

কতদূরের কোন মাঠে গরু চলে গেছে। ফিরে এসেছে আবার। ঠিক গোয়ালে। গোয়াল আর রান্নাঘর পাশাপাশি। গোয়াল আর রান্নাঘর দিয়ে ঘর শুরু। কেন? গোয়াল রান্নাঘর আলপনা সব রঙে রঙে রাঙা হয়ে যায়। কিভাবে?

পরের দিন কুরচি রোদ্দুর শ্যামচাঁদ আর গাঁয়ের ছোটরা দূরে তালগাছের সারি দেখে ছুট দেয় আলপথ ধরে। ওদের মাইলখানিক দূর থেকে দেখা যায়। শোনা যায় না। ওরা তালশাঁস খায়। নিয়ে আসে আমাদের জন্য। আমরা জিগ্যেস করি, কি করলি রে ওইখানে তোরা। ওরা জবাব দেয় না। বদলে গোটা অভিযানটা ওরা অভিনয়ে ঘটিয়ে তোলে। সন্ধ্যেবেলায় গোটা গ্রামসহ আমরা সে সব দেখি।

অন্ধকার আর নৈশব্দ তখন রঙে রঙিন হয়ে যায়।

...

এইভাবে অন্ধকার আর রঙ, এইভাবে রোদ্দুর আর আলপনা, গান আর পালাগান, গোয়াল আর মহাকাশ আমাদের ঘিরে আর জরিয়ে পাশে পাশে থাকুক।

চার কিলোমিটার দূরের বাজারে গেছিলাম রসদের প্রয়োজনে। কেনাকাটা সেরে একটু চা খেতে গেঁয়ো দোকানে দাঁড়াতেই দেখি আকাশ কালো করে মেঘ এসেছে। বৃষ্টি হবে। আমরা দ্রুত ফিরতি পথে। দুপাশে ক্ষেতের মধ্যে লাল কাঁকরের রাস্তা। ঝড় শুরু হবে নাকি? যদি মাথায় বাজ ভেঙে পরে।

বৃষ্টি হয়েছিল আগের দিন। বিকেলে। সারা পাড়ায় ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে এসে গান জমে উঠেছে। বাঘারে হবে। ঠিক তক্ষুনি।

যে বাড়ির উঠোনে অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল, সে বাড়ির ভিতরে আমরা আশ্রয় নিলাম। আমরা সকলে। আমরা এবং গ্রামবাসীরা। অভিনেতারা এবং দর্শকেরা।

আলো নেই। আবছা অন্ধকার। অল্প পরিসরে অত মানুষ। এ ওর গায়ে লেপটে বসে আর দাঁড়িয়ে রইল সকলে। অনেকক্ষন। বৃষ্টি আর থামে না। স্বস্তির বৃষ্টি। থামুক কেউ চায় না। বৃষ্টি দেখতে দেখতে কে যেন হঠাৎ গান ধরল একটা। ফলে ঢোল এবং মাদল, গিটার এবং বাঁশি ঝোলা থেকে বেড়িয়ে এলো। একের পর এক গান। সকলেই গাইছে। বাংলা গান। সাঁওতালী গান।

আমি তো গাইতে পারি না। বাজাতে জানি না। আমি শুনছি আর দেখছি।

দেখছি, তিনটে ঘরের আলাদা আলাদা চালার ঢাল অদ্ভুত এক জটিল পথ ধরে একটি নির্দিষ্ট সরলরেখায় এসে মিশেছে। সেখানে একটি টিনের নালা। ঐ নালার মাধ্যমে সম্পূর্ণ বাড়ির চালার জল এক সাথে একই পথে মাটিতে নেমে আসছে। যেখানে সেই জল মাটি স্পর্শ করছে ঠিক সেখানে একটি ছোট্ট গর্ত। নিপুণ হাতের নিকনো উঠোন ধুয়ে জল চলে যাচ্ছে কোথায়। তবু অনেকখানি জল ঐ গর্তে পরে রয়ে রয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির জল ধরে রাখার এই কি এক সনাতন পদ্ধতি?

কয়েকজন সাঁওতাল রমণী তখন গান ধরেছেন। বহুযুগ ধরে সে গান বৃষ্টি হয়ে ঝরে।

আর আমি ঠিক তক্ষুনি বজ্রাহত হই।

খুরুলের দিকে বাসটা ঘুরে গেল বলে আমাদের অনেকটা বেশি হাঁটতে হল। বাসস্ট্যান্ডটা কামারপাড়ায়। এখানেই বাজার। বেশ পুরনো অঞ্চল। বাড়িঘর প্রাচীন। একটা ক্ষয় হতে চলা টেরাকোটার মন্দির। অঞ্চলের অবস্থাপন্নদের বসতি এখানে। মূলত এদের মালিকানার চাষযোগ্য জমি ঘিরে রেখেছে কামারপাড়া। আদিবাসীদের প্রয়োজন হয়েছিল ঠিক এই কারণেই। অত জমি চাষ করবে কে?

আমরা যে গ্রামে ছিলাম, সেই মাঝেরডাঙায় যারা থাকেন তাঁরা সকলেই চারপাঁচ প্রজন্ম আগে দুমকা থেকে এসেছিলেন। আধাআধি ভাগে চাষ করেন প্রায় সব পরিবার। নিজের জমি বলতে কেবল বসতজমিটুকু। বাবুরা তাঁদের সেটুকু দিয়েছিলেন।

ধানদলসে তে এসে পাকা রাস্তা শেষ হয়ে গাঁয়ের রাস্তা ধরল। তিনটে গ্রাম পেরিয়ে একেবারে শেষে মাঝেরগ্রাম। আমাদের দল দেখে সকলেই কৌতূহলী হলেন। আমরাও আমাদের গন্তব্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রাথমিক আলাপ সেরে রাখতে রাখতে চললাম। মাঝেরগ্রাম ঢুকতেই একটা জটলা। আমরা তিনজন আগে একবার গাঁয়ে এসেছিলাম বলে আমাদের চিনতেন কয়েকজন। জানা গেল, দিন পনের আগে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। তাঁর সম্মানে হাঁড়িয়া প্রস্তুত হয়েছে। গাঁয়ের সকলেই হাঁড়িয়া গ্রহণ করবেন। এটাই আচার। ওঁরা আমাদের আন্তরিক আপ্যায়ন করে পাত্র করে হাঁড়িয়া তুলে দিলেন। কেউ কেউ তা পান করল।

এই কি মৃত্যুর শোকপালন? এই কি বিদায় জানানোর প্রথা? এমনও হয় শ্রদ্ধাজ্ঞাপন?

মাঝেরগ্রাম আমাদের স্বাগত জানালো।

...

যখন যেখানে আমরা গান গাইতে নাটক করতে গেছি, এক ভদ্রলোকের সাথে পথে দেখা হয়ে যেত। যেতই। খালি গা। লুঙ্গি পরা। তিনি আমাদের সঙ্গ দিতেন। নিঃশব্দে। একটু দূরে একা বসে থাকতেন। আমরা ফিরে এলে তিনি আবার গাঁয়ের কোন ফাকে মিলিয়ে যেতেন। ধান উঠে গেছে। কাজ প্রায় নেই। তিনি আমাদের নিয়মিত সদস্য হয়ে গেলেন।

শেষ দিন। আমরা দুপুরে ফিরে আসব। সকালে এক উঠোনে গানবাজনা হচ্ছে। তারপর নাটক হবে। আমরা গান ধরতেই দেখি সেই তিনি। এসেছেন। কিন্তু আজ আর তিনি বসে নেই। গাইছেন আমাদের সঙ্গে। এ কদিনে গানগুলো তাঁর জানা হয়ে গেছে। গান গাইছেন। গান জমে উঠছে। তিনি শরীর দুলিয়ে দিচ্ছেন। নেচে উঠছেন। গাইছেন আর নাচছেন।

নাটক শেষ হয়ে গেল। তিনি এসে আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। হাত ধরলেন। আর কি ! আমরা আর কী বা বলতে পারি!

কে যেন আমাদের জানিয়ে দিয়ে গেল, প্রথম দিন গাঁয়ে এসে আমরা যার শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানের অংশীদার হয়ে পরেছিলাম, ইনি তাঁরই পুত্র। আমরা তাঁর দিকে ফিরে তাকাই। দেখি তিনি দূরের একটি ঘরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন। ক্লান্ত তিনি। ঘামছেন। বিড়ি ধরিয়ে চেয়ে আছেন আকাশে। সদ্য পিতৃহারা সন্তানকে হঠাৎ কেমন ছোট্টটি মনে হয়। আকাশে তিনি কি তাঁর বাবাকে খুঁজছেন। তাঁর বাবা কি এই আকাশেই আছেন? না কি সেই মৃত বৃদ্ধ মুক্তি পেয়ে অন্য কোনোখানে চলে গেছেন? অন্য আকাশে? দুমকার আকাশে?

খেলতে খেলতে আমরা চলে যেতাম দূরে। আমি আর ভাই। মা রান্না করতে করতে নজর রাখত। সময় বয়ে যেত। আমরা ঘরে ফিরতাম না। জানতাম, মা ডাকবে – বাপিপাপ্পুউউউউউ...

পুকুরে ঝাঁপিয়ে পরতাম। পার ঘেঁসে দূর থেকে দৌড়ে এসে – ঝপাং...

পুকুরের জল শান্ত হয়ে যেত বিকেলে। আমরা বসে জলে প্রতিবিম্ব দেখতাম। সূর্যের নেমে আসা দেখতাম। তারপর একটা ঢিল ছুঁড়ে মারলে টলমল করে যেত সব। সূর্য টুকরো টুকরো হয়ে হাজার হাজারে ভেঙে যেত। স্বপ্নের রঙ দুলে দুলে ঢেউ হয়ে যেত। তারপর – ঝিলমিল...

বড় রাস্তার দোকানগুলোর পিছনে একটা মাঠ ছিল একান্তই আমাদের। আমরা দুটো দলে ভাগ হয়ে ফুটবল খেলতাম। সবুজ সবুজ ঘাসে ইচ্ছে করে গড়িয়ে পরলেই ফাউল। আমরাই খেলোয়াড় আমরাই রেফারি। বাঁ পায়ে প্রায় মারাদোনার মত শট নিতাম - গোওওওল...

সে মাঠে এখন প্যান্টালুন্স।

বিশাল বড় শোরুম। ঠাণ্ডা। চকচকে। ঝকঝকে। ভিতরে গেলে, আহা কী আরাম। ওরা আবার ম্যাডাম ম্যাডাম স্যার স্যার বলে ডাকে। আমার এই চালচুলোহীন জীবনকে এত আরামে এত দাম দিয়ে আর কে ডাকে !

বাইরে বেড়িয়ে এসে একবার ফিরে তাকাই। অকস্মাৎ চমক লাগে। কেউ কি আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ ঘষে দিলো নাকি ! এই কিছুদিন আগেও যে কাঠের দোকান, টুনি লাইটের দোকান, সাইকেল গ্যারেজ ছিল সেগুলো বেবাক উবে এমন অট্টালিকা বনে গেল ! সেই ঘেমো গা আর কড়াপরা হাতের মানুষগুলো গেল কোথায়? রবীন্দ্রনাথ বলে বসেন, “যে দিকটাতে ছাই, তোমার দৃষ্টি আজ সেই দিকটাতেই পড়েছে"।

উন্নয়নের ভরা বাজারে কচুরিপানায় বিলকুল ঢেকে যাওয়া নদী ফুটো করে দেয় ফুলতে থাকা অচ্ছে দিনের গ্যাসবেলুন। আমরা তখন রঞ্জনকে ডাকি। পাই না। শপিংমলে ভাঙা সারেঙ্গী খুঁজছেন যারা তাঁরা প্রতারক।

...

বিদায় মাঝেরডাঙা। ফিরে আসার জন্য – বিদায়।

আমাকে এত করে ডাকিস কেন, কিশোর। আমি কি শুনতে পাই নে”।

--

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

উত্তরবঙ্গের হাতি আর মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান / স্বাতী রায় / ৩য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা

  উত্তরবঙ্গের হাতি আর   মানুষ – সংঘাত নাকি সহাবস্থান স্বাতী রায় দৃশ্যটা প্রথম দেখেছিলাম উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক দূরে, উত্তরাখণ্ডের রাজাজী ...